দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজস্থানের কোটপুতলির ছোট্ট গ্রামে এখন শুধুই হাহাকার। চোখের জলও যেন শুকিয়ে এসেছে সকলের। তিন বছরের চেতনাকে বাঁচানোর জন্য (Chetna Rescue) পরিবারের আর্তি, উদ্ধারকর্মীদের নিরলস চেষ্টা আর গ্রামবাসীদের প্রার্থনায় যেন এক হৃদয়বিদারক নাটকের চিত্রনাট্য লিখছে। ২৩ ডিসেম্বর দুপুরের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত থেকে আজ ৯ দিন হয়ে গেল, রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার অবসান নেই এখনও।
৭০০ ফুট গভীর কুয়োর অন্ধকারে আটকে থাকা ছোট্ট চেতনার নিস্তব্ধতা সবাইকে তাড়া করে ফিরছে। তার ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত শরীর, তার মায়ের আকুল কান্না আর উদ্ধারকর্মীদের অনবরত শ্রম-- সবকিছু মিলে নির্মম একটা সময়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোটপুতলি। মাটির অনেক নীচে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে ফুটফুটে এক শিশু। সবাই কার্যত দেখছে।
এ যেন শুধু একটা দুর্ঘটনা নয়, মানুষের ধৈর্য আর আশার এক অগ্নিপরীক্ষা। মেয়েটিকে ফিরে পাওয়ার জন্য দিনরাত সংগ্রাম করে চলা উদ্ধারকর্মীরাও জান লড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, চেতনার নিস্তব্ধ শরীর কি আবার আলো দেখবে? তার ছোট্ট হৃদয় কি আবার প্রাণের স্পন্দনে ভরে উঠবে?
উত্তর জানা নেই কারও।
রাজস্থানের কোটপুতলিতে ৭০০ ফুট গভীর কুয়োয় আটকে থাকা আজ নবম দিন। এখনও তাকে উদ্ধার করা যায়নি। উদ্ধারকর্মীরা জানাচ্ছেন, চেতনা এখন ১২০ ফুট গভীরতায় একটি হুকের সঙ্গে ঝুলে রয়েছে। তার শরীর নড়াচড়া করছে না। তাকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ভীষণভাবে।
এনডিআরএফ কর্মীরা তাকে উদ্ধারের জন্য টানেল খুঁড়ছেন এখনও। রবিবার পর্যন্তও প্রশাসন এবং এনডিআরএফ দাবি করেছিল যে চেতনাকে সোমবারই উদ্ধার করা হবে, কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সোমবার রাতেও চেতনার মা ও পরিবারের সদস্যরা তার বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় ছিলেন, কিন্তু হতাশ হতে হয়েছে তাদের। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে ফের শুরু হয়েছে উদ্ধার কাজ।
পরিবারের অভিযোগ এবং প্রশাসনের সাফাই
উদ্ধারে দেরি হওয়ার কারণে চেতনার পরিবার এবং গ্রামবাসীরা প্রশাসনের ওপর গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ করা হলে চেতনা অনেক আগেই উদ্ধার হতো। তবে প্রশাসন গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পরিবারের অসন্তোষের মুখে সোমবার রাতে কোটপুতলি-বেয়রোদ কালেক্টর কল্পনা আগরওয়াল চেতনার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং উদ্ধার অভিযানের চ্যালেঞ্জগুলি ব্যাখ্যা করেন। কালেক্টর বলেন, 'আমরা সবরকম ভাবে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি, কিন্তু এই উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন। তাই সময় লাগছে।'
উদ্ধার অভিযান কীভাবে চলছে?
চেতনাকে উদ্ধার করতে ৬ জন এনডিআরএফ কর্মীর তিনটি দল তৈরি করা হয়েছে। প্রতি দলে ২ জন করে কর্মী রয়েছেন। তাঁরা ১৭০ ফুট গভীর খুঁড়ে রাখা গর্তে নেমে টানেল খোঁড়ার কাজ করছেন। প্রতিটি দল ২০-২৫ মিনিট করে কাজ করার পর বিশ্রাম নেয়, এবং পরবর্তী দল কাজে নেমে পড়ে।
অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হলেও, এতটা গভীরে নেমে কাজ করার কারণে সেনাদের শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। তার ওপর শক্ত পাথরের বাধার কারণে টানেল খোঁড়ার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
চেতনার দুর্ঘটনার টাইমলাইন
২৩ ডিসেম্বর:
- দুপুর দুটো নাগাদ কোটপুতলির কিরাতপুরার বড়িয়ালি ধানি এলাকায় খেলতে খেলতে ৭০০ ফুট গভীর কুয়োয় পড়ে যায় চেতনা।
- ১০ মিনিট পরে মেয়েটির কান্না শুনে পরিবার জানতে পারে, সে বোরওয়েলে পড়েছে।
- দুপুর ২:৩০-এ প্রশাসন, এনডিআরএফ এবং এসডিআরএফ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
- ৩:২০-এ চিকিৎসক দল উপস্থিত হয়।
- ৩:৪৫-এ পাইপের মাধ্যমে চেতনার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ শুরু হয়।
- বিকেল ৫:১৫-এ উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
- রাত ৮:৪৫-এ দেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে চেতনাকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়।
- রাত ৩:০০ পর্যন্ত দু'বার চেষ্টা করা হলেও ব্যর্থ হয়।
২৪ ডিসেম্বর:
- সকাল ৫:৩০ থেকে প্রশাসনের অভিযান শুরু হয়।
- পরিবারের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়, হুক ব্যবহার করে চেতনাকে উপরে তোলার।
- সকাল ৯:৩০ পর্যন্ত চেতনাকে ১৫ ফুট উপরে তোলা হয়।
- পুনরায় ব্যর্থতায় প্রশাসন হরিয়ানা থেকে পাইলিং মেশিন আনার সিদ্ধান্ত নেয়।
- রাত ১১:০০-এ পাইলিং মেশিন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
২৫ ডিসেম্বর:
- সকাল ৮:০০ থেকে পাইলিং মেশিন দিয়ে গর্ত খোঁড়া শুরু হয়।
- দুপুর ১:০০ পর্যন্ত ৪০ ফুট পর্যন্ত টানেল খোঁড়া হয়।
- সন্ধ্যায় পাঁচটি পাইলিং মেশিন জুড়ে ৪ ফুট পুরু বিট তৈরি করা হয়।
- বিকেল ৫:৩০ থেকে উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়।
- রাত ৬:০০-এ আরও একটি ২০০ ফুট ক্ষমতাসম্পন্ন পাইলিং মেশিন আনা হয়।
- রাত ৯:০০-এ চেতনার মা ঘোলি দেবীর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়।
- রাত ১১:০০-এ কালেক্টর কল্পনা আগরওয়াল ঘটনাস্থলে পৌঁছন।
২৬ ডিসেম্বর:
- সকাল ১০:০০-এ পাথরের বাধার কারণে পাইলিং মেশিন থেমে যায়।
- ছ'ঘণ্টার চেষ্টার পর পাথর কেটে ফেলা হয়।
- সন্ধ্যা ৬:০০-এ পাইলিং মেশিন সরিয়ে লোহার পাইপ বসানোর কাজ শুরু হয়।
২৭ ডিসেম্বর:
- দুপুর ১২:০০ পর্যন্ত ১৭০ ফুট গভীর গর্তে লোহার পাইপ বসানো সম্পন্ন হয়।
- দুপুর ১২:৪০-এ ১০০ টনের একটি মেশিন আনা হয় পাইপের ভার বহনের জন্য।
- বৃষ্টির কারণে দুপুর ১:০০-এ পাইপ ওয়েল্ডিংয়ের কাজ বন্ধ হয়।
- বিকেল ৫:০০-এ পুনরায় কাজ শুরু হয় এবং রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে।
২৮ ডিসেম্বর:
- এনডিআরএফ-এর ৬ সদস্যের দল গঠন করা হয়।
- দুই সদস্যের প্রতিটি দল ১৭০ ফুট গভীর গর্তে নেমে টানেল খোঁড়ার কাজ শুরু করে।
- চার ফুট গভীর টানেল খোঁড়া হয়।
২৯ ডিসেম্বর:
- টানেল খোঁড়ার কাজ চলতে থাকে।
- পাথর ভাঙার জন্য একটি কম্প্রেসর মেশিন আনা হয়।
- পাথর কাটার পদ্ধতি বোঝার জন্য খনির বিশেষজ্ঞ ডাকা হয়।
৩০ ডিসেম্বর:
- প্রশাসন এবং এনডিআরএফ দাবি করে যে চেতনাকে এই দিন উদ্ধার করা হবে।
- পাথর এবং অন্যান্য সমস্যার কারণে আবারও বিলম্ব হয়।
- টানেল খোঁড়ার সময় সেনারা শ্বাসকষ্টে ভোগে।
সব মিলিয়ে, ৯ দিন ধরে চলা উদ্ধারের চেষ্টায় এখনও কোনও আশার আলো দেখা যায়নি। চেতনার অবস্থানও প্রায় অপরিবর্তিত। প্রশাসন ও উদ্ধারকর্মীরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, কিন্তু গভীরতা এবং পাথরের বাধার কারণে অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। চেতনার পরিবার যেন ধৈর্যের অগ্নিপরীক্ষা দিচ্ছে। গোটা দেশ প্রার্থনা করছে, সুখবর পাওয়ার। বছরের শেষ দিনে কি অক্ষত ও জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা যাবে চেতনাকে? এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে।