
প্রতীকী চিত্র
শেষ আপডেট: 6 June 2024 13:24
শুভেন্দু ঘোষ
ছয় দশক। সময়টা কম নয়। এই এতগুলো বছর পর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ফেলে যাওয়া জুতোয় ফের পা গলাতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদী। টানা তৃতীয়বার দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে বসার যে রেকর্ড নেহরুর বুক পকেটের ঘড়ির সময় বন্ধ হয়ে পড়েছিল, ফের সেই ঘড়িতে দম দিতে চলেছেন মোদী। নীতি, আদর্শ, দর্শন, জ্ঞান, শিক্ষা- সবকিছুতেই দুই বিপরীত মেরুর অধিবাসী হলেও এই বিরল কৃতিত্বের ভাগীদার হতে চলেছেন বিজেপি নেতা মোদী।
স্বাধীন ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৫১ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তার আগে ১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় নেহরুকে প্রধানমন্ত্রী পদে বরণ করে নেওয়া হলেও সেই প্রথম জনমতের মুখোমুখি হন মহাত্মা গান্ধীর প্রিয় শিষ্য। ফলে নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময়সীমা তখন থেকেই ধরতে হবে।
৪৮৯ সদস্যবিশিষ্ট লোকসভায় প্রার্থী ছিলেন ১৯৪৯ জন। সেই সময় ভোটাধিকার ছিল ২১ বছর বয়স থেকে। মোট ৬৮ দফায় ভোটগ্রহণ হয়েছিল। সেই ভোটে কংগ্রেস অবধারিতভাবে সকলকে উড়িয়ে সরকার গঠন করে। কিন্তু, পরিসংখ্যান বলছে তখনও দেশের ৫৫ শতাংশ অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কংগ্রেসের বিপক্ষে অর্থাৎ বিরোধীদের ভোট দিয়েছিলেন। ৪৮৯টি আসনের মধ্যে ৩৬৪টি আসনে জিতেছিল নেহরুর কংগ্রেস।
নির্বাচনের লড়া ৫৩টি দল এবং ৫৩৩ জন নির্দলের মধ্যে কংগ্রেসের পরেই দ্বিতীয় স্থানে ছিল রামমনোহর লোহিয়া এবং জয়প্রকাশ নারায়ণের সোশ্যালিস্ট পার্টি। তারা ১২টি আসনে জিতে ১১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কারণ ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা দুর্বল হতে শুরু করেছে। বহু কংগ্রেস নেতা নেহরুর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় পৃথক দল গঠন করে ফেলেছেন।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জনসঙ্ঘ, বিআর আম্বেদকরের তফসিলি জাতি ফেডারেশন বা রিপাবলিকান পার্টি, কংগ্রেসের সভাপতি পুরুষোত্তম দাস ট্যান্ডন ইস্তফা দিয়েছেন। আচার্য কৃপালনী গড়ে তুলেছেন কিষাণ মজদুর প্রজা পরিষদ এবং কংগ্রেস বিরোধী কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া।
পাঁচ বছর পর রাজনৈতিক চিত্র ও চরিত্র আরও বদলে যায়। ১৯৫৭ সালের দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনেও কংগ্রেস ধুলোঝড়ে বিরোধীদের উড়িয়ে ক্ষমতায় আসে। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত নির্বাচন হয়েছিল। ৪৯৪টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস জিতেছিল ৩৭১টিতে। প্রাপ্ত ভোট শতাংশ ৪৫ থেকে বেড়ে হয় ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ ভারতের ৫২ শতাংশ ভোটার নেহরু জমানার বিরুদ্ধে ছিলেন।
১৯৬২ সালে হয় তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন। এবারেও জওহরলাল নেহরুর জয়জয়কার। কিন্তু, ভোট শতাংশ কমে হয়ে যায় ৪৪.৭ শতাংশ। ৪৯৪টি আসনের মধ্যে ৩৬১টিতে জেতে কংগ্রেস। কিন্তু এই বছরেই দুর্যোগ নেমে আসে চিনের ভারত সীমান্ত আক্রমণে। লালফৌজ সীমান্তের অনেকাংশ দখল করে ফেলায় বিরোধীদের তোপের মুখে পড়ে নেহরু সরকার। এরপর থেকেই নেহরু ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করেন। প্রায় ২ বছর বিভিন্নভাবে চিকিৎসার পরেও শারীরিক অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। লোকসভায় ১৯৬৪ সালের ২৭ মে তাঁর মৃত্যুর কথা ঘোষণা করা হয়। যদিও তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সকালেই।
নেহরু পরপর তিনবার ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, যে রেকর্ড এখনও পর্যন্ত কারও নেই। কিন্তু, তৃতীয়বার পূর্ণ মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারেননি। মোদী ৩ সরকার গঠিত হলে এবং রাজনৈতিক অঘটন না ঘটলে সম্ভবত তিনিই প্রথম এই মুকুট মাথায় পরবেন। নেহরু কন্যা ইন্দিরা গান্ধী দফায় দফায় তাঁর থেকেও বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন। কিন্তু, টানা তৃতীয়বার নয়, মাঝখানে কয়েক বছরের ফাঁক রয়েছে।
১৯৬৭ সালের নির্বাচনে জিতে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন। পরপর দুবার ভোটে জিতে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তিনি পদে ছিলেন। জরুরি অবস্থার পর কংগ্রেস মুখ থুবড়ে পড়ে গোটা দেশে। কিন্তু, বছর তিনেকের মধ্যেই জনতা দল সরকারকে ফেলে ১৯৮০ সালে ফের প্রধানমন্ত্রী হন এবং মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ওই পদেই ছিলেন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী ১৫ বছর ৩৫০ দিন কুর্সিতে ছিলেন।