১৩ বছর ধরে নিশ্চল কোমায় থাকা হরিশের লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার আবেদন নিয়ে বৃহস্পতিবার রায় স্থগিত রাখল সুপ্রিম কোর্ট।

হরিশ রানা সুস্থ অবস্থায় (বাঁদিকে) ও বর্তমান কোমা অবস্থায়, মাথার কাছে দাঁড়িয়ে বাবা।
শেষ আপডেট: 15 January 2026 14:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিল্লির ৩২ বছরের যুবক হরিশ রানার জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে এক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে দেশ। গত ১৩ বছর ধরে নিশ্চল কোমায় থাকা হরিশের লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার আবেদন নিয়ে বৃহস্পতিবার রায় স্থগিত রাখল সুপ্রিম কোর্ট। হরিশের বাবা-মায়ের করা বেদনাহীন করুণামৃত্যু মঞ্জুরের আবেদনের শুনানিতে বিষয়টিকে “অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল” বলে মন্তব্য করে আদালত।
শীর্ষ আদালতের বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ শুনানির আগে হরিশের বাবা-মায়ের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন। এরপর আদালত জানায়, “এই ধরনের বিষয় অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমরাও মরণশীল। কে বাঁচবে, কে মরবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারই বা আমাদের কে দিয়েছে? তবু আমরা লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করব।” আদালতবান্ধব হিসেবে হরিশের বাবা-মায়ের হয়ে বিস্তারিত সওয়াল এবং কেন্দ্রের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটির যুক্তি শোনার পরই আদালত এই মন্তব্য করে।
দিল্লির মহাবীর এনক্লেভের বাসিন্দা হরিশ রানা কিশোর বয়সে চণ্ডীগড়ে কলেজে পড়াশোনা করতে বাড়ি ছাড়েন। কিন্তু ২০১৩ সালের ২০ অগস্ট হঠাৎই ভেঙে পড়ে রানার পারিবারিক জীবন। পিজিতে থাকার সময় চারতলার বারান্দা থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মক মাথায় চোট পান হরিশ। সেই দুর্ঘটনাই তাঁর জীবনকে এক মুহূর্তে বদলে দেয়। চিকিৎসকদের মতে, ওই দুর্ঘটনার ফলে হরিশের শরীরে এসেছে শতভাগ অক্ষমতা। তারপর থেকে টানা ১৩ বছর ধরে তিনি রয়েছেন ‘পার্মানেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ। শ্বাস নেওয়া ও খাদ্য গ্রহণ— সবকিছুই টিউব ও যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল।
শুনানিতে আদালতবান্ধব যন্ত্রণাহীন করুণামৃত্যুর পক্ষে সওয়াল করে জানান, এটি কোনও মৃত্যুদণ্ড নয়, বরং স্বাভাবিক মৃত্যুকে একটু আগে করার প্রক্রিয়া। দুটি মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, হরিশের সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কার্যত শূন্য। তাঁর বক্তব্য, “এই ধরনের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া মানে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকারের লঙ্ঘন।”
বেঞ্চকে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে আদালতবান্ধব জানান, হরিশকে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে রাখা হবে। তাঁর শরীর থেকে খাবার ও শ্বাসের টিউব সরিয়ে নেওয়া হবে। কোনও চিকিৎসাগত হস্তক্ষেপ করা হবে না। “যাতে কোনও যন্ত্রণা না হয়, সে জন্য যন্ত্রণা নিরোধক ওষুধ দেওয়া হবে। সম্পূর্ণ আরামে, কষ্টহীনভাবে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তাঁকে,” জানান তিনি।
ভারতে অ্যাকটিভ ইউথেনেশিয়া বেআইনি হলেও প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া প্রথম স্বীকৃতি পায় ২০১১ সালে অরুণা শানবাগ মামলায়। মুম্বইয়ের একটি হাসপাতালের নার্স অরুণা শানবাগ ১৯৭৩ সালে যৌন হেনস্তার শিকার হয়ে দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময় কোমায় ছিলেন। যদিও আদালত তাঁর ক্ষেত্রে ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তিনি ২০১৫ সালে নিউমোনিয়ায় মারা যান। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্যাসিভ ইউথেনেশিয়াকে আইনসম্মত ঘোষণা করে এবং স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করে।
আদালতবান্ধবের যুক্তির সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে কেন্দ্রের পক্ষে সওয়ালকারী ঐশ্বর্য ভাটি বলেন, হরিশের ক্ষেত্রেই প্রথমবার আদালতের ইউথেনেশিয়া সংক্রান্ত নির্দেশিকা বাস্তবে প্রয়োগ হতে চলেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “মৃত্যু যেন কোনও অবহেলার কারণে না হয়। মৃত্যু হতে হবে রোগের স্বাভাবিক পরিণতিতে। চিকিৎসা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সরাসরি মৃত্যুর কারণ হতে পারে না।” একই সঙ্গে তিনি টার্মিনাল রোগীদের দেখভাল করা পরিবারগুলির মতামত ও ভোগান্তি নিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরির আবেদন জানান। হরিশের বাবা-মায়ের দীর্ঘ আইনি লড়াই ও মানসিক যন্ত্রণা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই লড়াই কেবল আদালতের নয়, মানবিকতারও।
সওয়ালের শেষে ঐশ্বর্য ভাটি বলেন, “গত ১৩ বছর ধরে হরিশ অপরিবর্তনীয় ভেজিটেটিভ স্টেটে রয়েছেন। এখন তিনি শুধু চামড়া আর হাড়।” সব যুক্তি শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার রায় স্থগিত রেখেছে। এখন দেশ তাকিয়ে আদালতের সেই সিদ্ধান্তের দিকে, যে সিদ্ধান্ত ঠিক করবে, যন্ত্রণার জীবন নাকি মর্যাদার মৃত্যু, কী অপেক্ষা করছে হরিশ রানার বেঁচে থাকার দুঃসহ পথের জন্য। যার সঙ্গে ভুক্তভোগী তাঁর পরিবারও।