
নিজস্ব ছবি
শেষ আপডেট: 26 January 2025 13:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৫০-এ ভারতের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসে অতিথি ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি সুকর্ন। সদ্য স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দেশের সংবিধান প্রণয়নের দিনে রাষ্ট্রীয় অতিথি করে এনেছিলেন সুকর্নকে।
৬১ বছর পর ২০১১ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসেও প্রধান অতিথি ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সুসিলো বমব্যাং ইউধোন্য। ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন সদ্য প্রয়াত মনমোহন সিং।
আট বছরের মাথায় ২০১৮ সালে আসিয়ান (অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস) ভুক্ত দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই সুত্রে আসিয়ানের সদস্য দেশ ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জোকো উইদোদো প্রজাতন্ত্র দিবসের অতিথি ছিলেন। ২০২৫-এ সেই ইন্দোনেশিয়ারই বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রাবউ সুবিয়ান্তকে ভারতের ৭৬তম প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি। শনিবার দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে দীর্ঘ বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয়ে কথা হয় প্রাবউ সুবিয়ান্ত এবং নরেন্দ্র মোদীর।
ভারতের ৭৬টি প্রজাতন্ত্র দিবসে যে ইন্দোনেশিয়ার যে চার রাষ্ট্রপতি অতিথি হয়ে এসেছেন, তাঁদের প্রথম দু’জনের সময় কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস। ২০১৮-তে ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এসেছিলেন আসিয়ান দেশগুলির সদস্য দেশের প্রতিনিধি হিসাবে। সে দিক থেকে বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদীর সরকারের তরফে এককভাবে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ এবারই প্রথম।
বিগত কয়েক বছর ধরেই ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুই দেশের বিদেশমন্ত্রী যথাক্রমে রেতনো মারসুদি এবং এস জয়শঙ্করের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় আছে। দুই দেশ নিয়ম করে ফরেন অফিস কনসালটেশনের বৈঠক করে আসছে। ২০২৩-এ ভারতের উদ্যোগেই ব্রিকসের সদস্য হয় ইন্দোনেশিয়া, যা দু-দেশের অর্থনৈতিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ করেছে। জি-২০ দেশগুলির বার্ষিক সম্মেলন ২০২২-এ ইন্দোনেশিয়ায়, পরের বছর ভারতে অনুষ্ঠিত হয়।
যদিও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল মনে করছে, ৭৬তম প্রজাতন্ত্র দিবসে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতিকে প্রধান অতিথি করে নরেন্দ্র মোদীর সরকার এক ভিন্ন বার্তাও দিতে চেয়েছে। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২৪ কোটি মুসলিমের বাস ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতিকে প্রজাতন্ত্র দিবসে রাষ্ট্রীয় অতিথি করে গোড়া হিন্দুত্ববাদী মোদী সরকার দেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি ধর্মীয় সহিষ্ণুতার বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি এবং ভারতের প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতিকে মান্যতা দেওয়ার পাঠ দিতে চেয়েছে বলে মনে করছে রাজনীতির কোনও কোনও বিশেষজ্ঞরা।
ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানানো প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রতিও এক বার্তা বলেও মনে করছে কূটনৈতিক মহল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পড়শি দেশে ইসলামিক উগ্রবাদ মাথা তোলার পাশাপাশি ভারতের বর্তমান সরকারকে ইসলাম বিরোধী বলে জোরকদমে প্রচার চলছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিমের দেশ ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতিকে ভারত দেশের প্রধান রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অতিথি করে বাংলাদেশকেও বার্তা দিতে চেয়েছে, ইসলামের সঙ্গে পড়শি এই দেশের কোনও সংঘাত নেই।
৮৭ শতাংশ মুসলিমের দেশ ইন্দোনেশিয়ার সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে রয়েছে হিন্দু ধর্মের নিদর্শন। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী তথা বিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অটল বিহারী বাজপেয়ী হিন্দুত্ব নিয়ে বিতর্কে বারে বারে ইন্দোনেশিয়াকে হাতিয়ার করেছেন। বিদেশমন্ত্রী থাকাকালে দেশে সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বাজপেয়ি বলতেন, ‘ইন্দোনেশিয়া সফরে আমাকে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হয়েছিল। সেখানে রামায়ণ মঞ্চস্থ হচ্ছে দেখে আমি ইন্দোনেশিয়ার বিদেশমন্ত্রীকে বলি, এটা কী হচ্ছে? তিনি বলেন, রামায়ণের কাহিনি অবলম্বনে যাত্রাপালা হচ্ছে। আমি তাঁকে বললাম, সে তো আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনারা তো মুসলিম প্রধান দেশ। জবাবে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি আমায় বলেন, তাতে কী হয়েছে, আমাদের অতীত হল রামায়ণ, মহাভারত। আমরা পড়ে মুসলিম হয়েছি।’ বাজপেয়ী ওই কথার মাধ্যমে ভারতে মুসলিম-সহ অন্য সংখ্যালগুদের হিন্দু সংস্কৃতিকে মানত্যা, গ্রহণ এবং সেগুলির প্রতি শ্রদ্ধাবান হওয়ার বার্তা দিতেন বলে মনে করা হয়।
অনেকেই মনে করছেন, অর্থনৈতিকভাবে সবল এবং দ্রুত উন্নয়নশীল ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সে দেশের রাষ্ট্রপতিতে আমন্ত্রণ জানানো মোদী সরকারের যেমন বিদেশ নীতির কৌশলগত অবস্থান, পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।