গাজিয়াবাদের তিন বোনের মৃত্যুতে উঠে আসছে কোরিয়ান সংস্কৃতিতে আসক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়া পরিচয়ের তত্ত্ব। বাবার হস্তক্ষেপে ফোন কেড়ে নেওয়ার পরই ভেঙে পড়ে তিন কিশোরী।

গাজিয়াবাদের ঘটনায় যুক্ত তিন কিশোরী
শেষ আপডেট: 5 February 2026 12:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে ন’তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী তিন কিশোরী ভিশিকা (১৬), প্রাচী (১৪) ও পাখি (১২)। বুধবার ভোরের এই ঘটনার পিছনে একাধিক স্তর খতিয়ে দেখছে পুলিশ। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, কোনও কোরিয়ান টাস্ক-ভিত্তিক গেমে (Task-Based Korean Game) ‘শেষ নির্দেশ’ ছিল আত্মহত্যা। তবে তদন্ত এগোতেই সামনে এল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি, কোরিয়ান বিনোদন আর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি অন্ধ আসক্তি, আর তারই মাঝে তীব্র পারিবারিক সংকট। সবমিলিয়ে মানসিক অবসাদ গ্রাস করেছিল খানিকটা।
পুলিশ সূত্রে খবর, তিন বোনেরই কোরিয়ান সংস্কৃতি (Korean Culture) নিয়ে বাড়াবাড়ি ছিল। বাড়িতে ফোন কেড়ে নেওয়ার পর থেকেই মানসিক অস্থিরতা বাড়ছিল তিনজনের মধ্যে। তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, কোরিয়ান নামে যে তিন মেয়ের অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তা ক’দিন আগে জানতে পারেন বাবা চেতন কুমার (Chetan Kumar)। তারপরই ওই অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দেন এবং ফোন কেড়ে নেন।
এত ঋণ ছিল বাজারে যে পরে ওই ফোন বিক্রি করেই দেনার টাকা মেটানোর চেষ্টা করেন। দেন বিদ্যুতের বিল। পুলিশ জানতে পেরেছে, চেতন কুমার পড়াশোনা নিয়ে বিরাট বকাঝকা করছিলেন, ফোন নিয়েও কিন্তু কোনও উপায় না বেরনোয় শেষে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার ভয় দেখান। উত্তরে নাকি তিন কিশোরী দাবি করেছিল, “আমরা ভারতীয় নই, কোরিয়ান। তাই ভারতীয়কে বিয়ে করব না!”
সুইসাইড নোটে কোরিয়ানের প্রতি ‘অন্ধ প্রেম’
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয়েছে আট পাতার একটি পকেট ডায়েরি। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় লেখা, “ইস ডায়েরি মে জো কুছ ভি লেখা হ্যায়, সাব পড় লো, কিউকি ইয়ে সব সাচ্চ হ্যায়… সরি পাপা।” শেষে একটি হাতে আঁকা কান্নার ইমোজিও রয়েছে।
ডায়েরির বয়ান বলছে, ফোন না থাকা তো বটেই, কোরিয়ান ড্রামা (K-Drama) দেখতে না পারাই তাঁদের কাছে অসম্ভব আঘাত ছিল। লেখা রয়েছে, “কোরিয়ান ছিল আমাদের জীবন। ওটাই সব। তুমি কীভাবে আমাদের জীবন থেকে সেটা ছিনিয়ে নিলে? এখন বোঝো কী হতে পারে। তোমাদের থেকেও আমরা কোরিয়ান অভিনেতা আর কে-পপ গ্রুপকে বেশি ভালবাসতাম।”
আবার একটি অংশে লেখা, “তুমি আমাদের ভারতীয় ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলে। আমরা সেটা কখনও হতে দিতাম না। তাই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত।”
স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়েছিল দু'বছর আগে
পুলিশ জানাচ্ছে, কোভিডের পর থেকে মোবাইলে চরম আসক্তি তৈরি হয়। চেতন কুমারের দাবি ছিল, সেই জন্যই নাকি পড়াশোনা করতে চাইত না তিনজন। সঙ্গে স্কুল যাওয়াও নিজেরাই বন্ধ করে। কিন্তু ঘটনার একদিন পর তদন্ত বলছে অন্য কথা। পুলিশের দাবি, প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে বাবার আর্থিক বিপর্যয়ের ফলেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয় তিন বোনের। পরিবারে চরম অস্থিরতা, দেনার চাপ, আর ডিজিটাল আসক্তি- সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছিল এমন পরিস্থিতি।
শুরুতে যে ‘কোরিয়ান টাস্ক-গেম’-এর তত্ত্ব ঘুরছিল, পুলিশ এখন স্পষ্ট জানাচ্ছে, খুনে গেমের প্রমাণ এখনও মেলেনি। বরং কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি তীব্র মোহ আর পারিবারিক অশান্তি— দু’য়ের মিলিত প্রভাবেই তিন বোন ভয়াবহ পদক্ষেপ করে।