সংসদীয় কমিটি বলছে, জাতীয় পরীক্ষার সিলেবাস স্কুল পাঠ্যক্রম থেকে বিচ্যুত হয়ে কোচিং ইন্ডাস্ট্রিকে সুবিধা দিচ্ছে।

শেষ আপডেট: 8 December 2025 19:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা ও নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি আর দুর্বল ব্যবস্থাপনা নিয়ে যখন প্রবল বিতর্ক চলছে, ঠিক সেই সময়ই সংসদের স্থায়ী কমিটি তুলে ধরল কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হল, “স্কুলের পাঠ্যক্রমকে পাশ কাটিয়ে পরীক্ষার সিলেবাস কেন অন্য পথে হাঁটছে? এই পরিবর্তনে কি কোচিং–কেন্দ্রিক ব্যবসাকেই শক্তিশালী করা হচ্ছে?”
কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ দিগ্বিজয় সিংয়ের নেতৃত্বাধীন এই কমিটির পর্যবেক্ষণ—এনটিএ পরিচালিত বহু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এখন আর স্কুলের কারিকুলামের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি হয় না। এর ফলে যে ছাত্রছাত্রীরা অতিরিক্ত কোচিংয়ের সামর্থ্য রাখে না, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কমিটির মতে, এটি শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে, সমান সুযোগের নীতি ভঙ্গ করছে।
প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কা নিয়ে কেন্দ্র যখনও প্রযুক্তিনির্ভর CBT–কেই এগিয়ে রাখতে চায়, সংসদীয় কমিটি একেবারে উল্টো অবস্থান নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, খাতা–কলম পরীক্ষার ঝুঁকি চোখে দেখা যায়, কিন্তু CBT পরীক্ষায় হ্যাকিংয়ের বিপদ গভীর ও অদৃশ্য।
কমিটির মত, এনটিএ–র উচিত UPSC ও CBSE–র উদাহরণ মেনে আবার কাগজ-কলম মডেলকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তবে যদি CBT হয়ও, তা যেন কেবলমাত্র সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন পরীক্ষাকেন্দ্রেই অনুষ্ঠিত হয়, বেসরকারি কেন্দ্রে নয়।
গত বছরের NEET পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। কমিটির রিপোর্ট বলছে, এনটিএ–র ১৪টি পরীক্ষার মধ্যে ৫টিতে বড়সড় ত্রুটি এবং তিনটি পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছিল।
ফলে পরীক্ষা পরিচালনার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও নজরদারি আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইসরোর প্রাক্তন প্রধান কে রাধাকৃষ্ণনের নেতৃত্বাধীন কমিটি ধাপে ধাপে CBT–তে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিল। কিন্তু সংসদীয় কমিটির স্পষ্ট বক্তব্য, “প্রথমে পরীক্ষার নিরাপত্তার বলয় মজবুত করতে হবে, তারপর প্রযুক্তিগত পরিবর্তন।”
অর্থাৎ নিরাপত্তা ছাড়া আগ্রসর হওয়ার সুযোগ নেই।
গত ছ’বছরে এনটিএ আয় করেছে প্রায় ৩,৫১২.৯৮ কোটি টাকা, ব্যয় করেছে ৩,০৬৪.৭৭ কোটি। উদ্বৃত্ত—৪৪৮ কোটি টাকা।
কমিটির প্রশ্ন, এই বিপুল অর্থ এখন কোথায় ব্যবহার হচ্ছে? তা কি সত্যিই পরীক্ষার অবকাঠামো উন্নতিতে লাগানো হচ্ছে? পাশাপাশি তাদের সুপারিশ, এই তহবিল স্বচ্ছভাবে পরীক্ষা–নিরাপত্তা, নিজস্ব সার্ভার, প্রযুক্তিগত নজরদারি ইত্যাদিতে ব্যয় করতে হবে।
এসবের পাশাপাশি, CUET–এর ফল প্রকাশে দেরি চলছে বেশ কিছু বছর ধরেই। কমিটির রিপোর্ট জানায়, ভর্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে, অ্যাকাডেমিক সেশনের শুরু পিছোচ্ছে, ছাত্রছাত্রীদের মানসিক চাপ বেড়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুত ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ফলপ্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত।
এই রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, “স্কুলের কারিকুলাম থেকে সিলেবাস সরিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাকে আলাদা পথে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়—এটি কোচিং ইন্ডাস্ট্রির পক্ষে প্রভাবিত সিদ্ধান্ত।”
কমিটির বক্তব্য,
• পরীক্ষার প্রশ্ন অবশ্যই স্কুল পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে
• যাতে অযথা কোচিং নির্ভরতা না বাড়ে
• আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলো বঞ্চিত না হয়
• শিক্ষার ক্ষেত্র আরও সমতামূলক হয়
এছাড়া লাগামহীন কোচিং সেন্টার নিয়ন্ত্রণে উচ্চস্তরের কমিটি গঠনের সুপারিশও করেছে তারা।
সিবিআই ইতিমধ্যেই তদন্ত করছে NAAC–এ ঘুষের অভিযোগ নিয়ে। অভিযোগ—গুন্টুরের KLEF–কে A++ গ্রেড দিতে টাকা লেনদেন হয়েছে।
সংসদীয় কমিটির দাবি, অবিলম্বে অভ্যন্তরীণ তদন্ত, সংসদে রিপোর্ট পেশ, মূল্যায়ন আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হতে হবে।
NAAC ইতিমধ্যেই ২০০টি প্রতিষ্ঠানের গ্রেড পুনর্বিবেচনা করেছে, ৯০০ পিয়ার অ্যাসেসর বাদ দিয়েছে। তবে কমিটির মতে, পুরো প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা জনসমক্ষে রাখা উচিত।
২০২২–এর রাধাকৃষ্ণন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এক নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি শীঘ্রই চালু হতে পারে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রক।
দেশজুড়ে পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন প্রশ্নের মুখে। এই পরিস্থিতিতে সংসদীয় কমিটির মূল প্রশ্ন, “শিক্ষার ভিত্তিকাঠামো কি কোচিংনির্ভর বাণিজ্যের হাতে চলে যাচ্ছে?”
শিক্ষাজগতের মত, এই রিপোর্ট ভবিষ্যতের পরীক্ষাব্যবস্থার জন্য এক স্পষ্ট রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছে।