
কেদারনাথের ঠিক মাথার উপর সুমেরু পর্বত থেকে নেমে এসেছিল বরফের বিরাটাকার গোলা।
শেষ আপডেট: 2 July 2024 14:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশী-বিদেশি পর্যটকদের চিরকালীন আকর্ষণ উত্তরাখণ্ড কি ধ্বংস হতে চলেছে? উত্তরাখণ্ডের গোটা হিমালয় পার্বত্য এলাকা ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের অভিমত। যার মধ্যে বাবা কেদারনাথের তীর্থভূমি কেদারনাথ উপত্যকাও আছে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস সত্যি হলে এই তাবৎ অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি, মেঘভাঙা বৃষ্টি এবং হড়পা বানের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এর বাইরে বিপদের গেরো রয়েছে হিমবাহগুলির অবস্থা নিয়েও। উত্তরাখণ্ড সরকার ১৩টি এরকম হিমবাহ থেকে সৃষ্ট হ্রদ নিয়ে সমীক্ষা করতে চলেছে। যাতে আগের দুবারে অভিজ্ঞতার মতো পরিস্থিতি যথাসম্ভব রোধ করা যায়।
এই গত ৩০ জুন একটি তুষারধস হয়েছিল। কেদারনাথের ঠিক মাথার উপর সুমেরু পর্বত থেকে নেমে এসেছিল বরফের বিরাটাকার গোলা। গতবছরেও একবার হয়েছিল। এমনকী তার আগের বছরেও। কিন্তু, কেন বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে? এরকমটা হওয়ার কারণ হল, যখন বরফের পিণ্ড গলে বৃষ্টিতে পরিণত না হয়ে খসে নেমে আসে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কেবলমাত্র কেদারনাথ নয় উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন এলাকা সহ তাবড় হিমালয় পার্বত্য পাদদেশ এই বিনাশকালের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
উত্তরাখণ্ড সরকার এরকম ১৩টি হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদকে চিহ্নিত করেছে। সমীক্ষায় দেখা হবে, এই হ্রদগুলি যদি ভেঙে পড়ে কিংবা বিস্ফোরণের মতো জলোচ্ছ্বাস হয় তাহলে কীভাবে প্রকৃতির তাণ্ডবনৃত্য ঠেকানো যাবে! ২০১৩ সালে হিমালয় পাদদেশীয় এলাকায় এরকমই একটি ঘটনা ঘটেছিল। উত্তরাখণ্ডে এরকম অসংখ্য হিমবাহ সৃষ্ট জলাধার আছে যেগুলি খুবই বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে সেগুলি থেকে জলোচ্ছ্বাস হতে পারে।
আপাতত পাঁচটিকে হাইরিস্ক জোনে ফেলা হয়েছে। সেগুলি হল, ডেরমা, লা সার্লিং ঘাটি, পিথোরাগড় জেলার কুটিয়াঙ্গটি উপত্যকা এবং চামোলি জেলার ধৌলি গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত বসুন্ধরা তাল। এই সবকটি হ্রদ প্রায় ০.০২ থেকে ০.৫০ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে রয়েছে।
ভারতের আবহাওয়া দফতর জুলাই মাসে হিমালয় পার্বত্য এলাকায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি করেছে। যার ফলে পশ্চিম হিমালয় অঞ্চলে হড়পা বান ও মেঘভাঙা বৃষ্টিরও সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি মাসে স্বাভাবিকের থেকে বেশি বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মৌসম ভবন। এতে পশ্চিম হিমালয়ের রাজ্যগুলির নদী অববাহিকায় জলস্তর হু-হু করে বাড়বে। কারণ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলির উৎপত্তিস্থলই হল এই এলাকা।
আবহাওয়া দফতরের প্রধান মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র বলেন, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, জম্মু-কাশ্মীর এবং পশ্চিম হিমালয়ের পাদদেশীয় এলাকায় অতিবৃষ্টি, মেঘভাঙা বৃষ্টি হতে পারে। যার ফলে প্রাণঘাতী ধস এবং হড়পা বান হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। যে কারণে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই এইসব হিমকুণ্ডের সমীক্ষার কাজ শুরু হবে। মোটামুটিভাবে এই হিমকুণ্ডগুলি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪০০০ মিটার বা ১৩ হাজার ১২৩ ফুট উঁচুতে রয়েছে। ফলে সেগুলির উচ্চতা, গভীরতা, বিস্তৃতি এবং বিপদের সম্ভাবনা কত দূর, তা নিরূপণ করাও বেশ দুরূহ কাজ।
নদী অববাহিকায় মোট কতগুলি হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদ বা হিমকুণ্ড আছে তাও একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। যেমন, টনস অববাহিকা, যমুনা, ভাগীরথী, ভিলানগঙ্গা, মন্দাকিনী (এখানেই রয়েছে কেদারনাথ ধাম, সোনপ্রয়াগ, মধ্যমহেশ্বর বা মদমহেশ্বর, উখিমঠ, অগস্ত্যমুনি, রুদ্রপ্রয়াগ), পিণ্ডার, গৌরীগঙ্গা বা গোরিগঙ্গা, ধৌলিগঙ্গা, অলকানন্দা (এখানে রয়েছে হেমকুণ্ড সাহিব, কাগভুষুণ্ডী তাল, বদ্রীনাথ, জোশিমঠ, চামোলি, ধৌলিগঙ্গা, কর্ণপ্রয়াগের মতো পর্যটন ও তীর্থস্থান), কুটিয়াঙ্গটি অববাহিকা।
কেদারনাথ উপত্যকার বিপদের আশঙ্কা কতটা? কেদারনাথ শহর রয়েছে মন্দাকিনী নদী উপত্যকায়। প্রায় ৬৭ বর্গকিমি এলাকা জুড়ে শহর এলাকা। একদিকে মন্দাকিনী অন্যদিকে সরস্বতী এসে মিলেছে কেদারনাথ মন্দিরের কাছে। এই দুই নদীর উৎসস্থলেই মন্দিরের মাথার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে চোরাবারি হিমবাহ। মাত ২ কিমি উঁচুতে রয়েছে এখন গান্ধী সরোবর নামে এই হিমকুণ্ড।
২০১৩ সালে এই চোরাবারি হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদের বরফের পাঁচিল ভেঙে গিয়ে নেমে আসে জলস্রোত। সেকেন্ডে ১৪২৯ কিউবিক মিটার গতিতে জলের ধারা নেমে আসায় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা। যার প্রভাব পড়ে হরিদ্বার পর্যন্ত।