প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi) জাতির উদ্দেশে ভাষণে স্বদেশি আন্দোলনের ডাক দিলেন। জিএসটি সংস্কারকে (GST Reform) বললেন “সাশ্রয়ের উৎসব”। কূটনৈতিক বাস্তবতার মাঝেই উঠছে নতুন বিতর্ক।

নরেন্দ্র মোদীর স্বদেশি মন্ত্র।
শেষ আপডেট: 21 September 2025 18:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ভারতের পণ্যের উপর শুল্ক চাপানোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, কিংবা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চিনা পণ্য দেশীয় বাজারে ঝড় তুলছে— তখন দু’জনকেই কার্যত বার্তা দিয়ে স্বদেশি আন্দোলনের ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবাসরীয় বিকেলে জাতির উদ্দেশে ভাষণে ফের একবার আত্মনির্ভর ভারতের মন্ত্র উচ্চারণ করলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “আমাদের দোকানপাট সাজুক স্বদেশি পণ্যে। গর্ব করে বলুন, আমি স্বদেশি কিনি, আমি স্বদেশি বিক্রি করি। ভারতে উৎপাদিত যখন বিশ্বসেরা হয়ে উঠবে, তখনই প্রকৃত উন্নতি হবে দেশের।”
তবে তাঁর বক্তৃতা শেষ হতে না হতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এই বোধোদয় এত দেরিতে কেন? ২০১৪ সালে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। তার পর দশ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে আমেরিকাকে তোয়াজ করে চলতে। ভারত-চিন বাণিজ্য ঘাটতি যে আজ ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, তাও হয়েছে মোদীর শাসনকালেই। ফলে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা অনেকেই বলছেন, ট্রাম্পের দাদাগিরির মুখে পড়ে এ হল নেতিবাচক পরিস্থিতিকে ঘোরানোর চেষ্টা। জাতীয়তাবাদ দিয়ে কূটনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার প্রয়াস।
প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান অনেকের মনেই ফিরিয়ে এনেছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই সময়কে, যখন স্বদেশি আন্দোলন হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক বড় অস্ত্র। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের মূল বার্তা ছিল— বিদেশি পণ্য বর্জন করো, দেশীয় পণ্য ব্যবহার করো। সেসময়ে দেশজুড়ে বিদেশি কাপড় পোড়ানো, ইংরেজি পণ্যের দোকান বর্জন, দেশীয় তাঁতের কাপড় বা হস্তশিল্প ব্যবহারের প্রচার দেখা গিয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাল গঙ্গাধর তিলক, অরবিন্দ ঘোষ-সহ বহু নেতা সেই সময় মানুষকে স্বদেশি শিল্প ও উৎপাদনকে সমর্থন করার ডাক দিয়েছিলেন। শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, এই আন্দোলন সাধারণ মানুষকে আত্মমর্যাদার বার্তাও দিয়েছিল। মোদীর স্বদেশি আন্দোলনের ডাক তাই কৌশলগত বলেই অনেকের মত।
বস্তত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে যে নতুন হারে জিএসটি লাগু হতে চলেছে সেই ঘোষণা নতুন নয়। এদিন প্রকারান্তরে তার রাজনৈতিক কৃতিত্ব দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতির উদ্দেশে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জিএসটি সাশ্রয় উৎসব শুরু হয়ে যাবে। এই সাশ্রয় উৎসবে আপনার সাশ্রয় বাড়বে। পণ্য কেনায় সুরাহা হবে। গরিব, মহিলা, ব্যবসায়ী, দোকানদার, নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেক ফায়দা হবে। তার মানে উৎসবের এই মরশুমে সবার মুখ মিষ্টি হবে। দেশের কোটি কোটি জনতাকে নেক্সট জেনারেশন জিএসটি রিফর্মের জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি”।
তাঁর কথায়, তিনি ক্ষমতায় আসার আগে দেশে টোল আর ট্যাক্সের জঞ্জাল ছিল। একশো রকমের কর ব্যবস্থা ছিল। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পণ্য পাঠাতে গেলে হাজারো ফর্ম ফিল আপ করতে হত বা কর দিতে হত। তাই ক্ষমতায় এসেই পণ্য পরিষেবা কর তথা জিএসটি-কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি। সব রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীন ভারতে সবচেয়ে বড় সংস্কার সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “সংস্কার একটা অনবরত প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন বদলায়। তখন নেক্সট জেনারেশন রিফর্ম দরকার হয়। জিএসটি ব্যবস্থায় এখন স্রেফ ৫ ও ১৮ শতাংশ স্ল্যাব রয়েছে। তার মানে রোজকারের দরকারি পণ্য আরও সস্তা হবে। ব্রাশ, পেস্ট, সাবান, স্বাস্থ্য বিমা সহ পণ্য ও বহু পরিষেবা এখন সস্তা হবে বা কর মুক্ত হবে।”
সার্বিক এই সাশ্রয়কে ডবল বোনানজা বলে আখ্যা দিয়েছেন মোদী। তাঁর কথায়, “এ বছর ব্যক্তিগত আয়করে ছাড় আর জিএসটি সংস্কারের ফলে সাধারণ মানুষের আড়াই লক্ষ কোটি টাকার সাশ্রয় হবে। তাই তো বলছি এটা হল সাশ্রয়ের উৎসব।”
এর পরেই স্বদেশি আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “বহু বিদেশি পণ্য আমাদের রোজকারের জীবনের সঙ্গে জুড়ে গেছে। আমাদের এর থেকে মুক্তি পেতে হবে। আমাদের সেই জিনিস কিনতে হবে যাতে আমাদের দেশের মানুষের শ্রম রয়েছে। ঘাম রয়েছে। সব দোকানকে স্বদেশিতে সাজাতে হবে। গর্বের সঙ্গে বলুন আমি স্বদেশি কিনি, আমি স্বদেশি বিক্রি করি। যখন এটা হবে, তখন দেশের উন্নতিও দ্রুত হবে”। দেশের সব রাজ্যকে স্বদেশি পণ্য উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ গড়ে তোলারও আহ্বাণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এখন দেখার প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তৃতা নিয়ে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক মহল কী প্রতিক্রিয়া জানায়।