গাছগাছড়া-জড়িবুটি ভিত্তিক চিকিৎসার (Plant-based Medicine) দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এই ফাঁকটা চোখে পড়ার মতো ছিল।

প্রতীকী ছবি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
শেষ আপডেট: 20 January 2026 16:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ক্যানসার ধরা পড়ার পর সমিষ্ট সেহগলের ঠাকুমার চিকিৎসা শুরু হলেও পরিবার দ্রুত বুঝে যায়, ওষুধ আর থেরাপির সঙ্গে আসে আরও অনেক সমস্যা। খাওয়ার ইচ্ছে কমে যাওয়া, ঘুম না হওয়া, শরীর-মন দু’দিকেই অস্বস্তি। “আমরা শুধু ওঁর বেঁচে থাকাটাকে একটু সহজ করতে চেয়েছিলাম। ভালো করে খেতে পারা, ঘুমোতে পারা, আর মানসিকভাবে একটু শান্তিতে থাকা,” বলেন সেহগল। তাঁর কথায়, সুযোগ বলতে ছিল আফিম জাতীয় কিছু ওষুধ বা কিছু আরামদায়ক দাওয়াই। তখন আমাকে আমেরিকার কিছু ডাক্তার আর বন্ধু ‘মেডিক্যাল ক্যানাবিস’ (Medical Cannabis) বা চিকিৎসা সংক্রান্ত গাঁজা ব্যবহারের পরামর্শ দেন। পরামর্শটা যেমন অবাক করার মতো ছিল, তার থেকেও বেশি দুশ্চিন্তার ছিল, ভারতে সেই ওষুধ খুঁজে পাওয়া কতটা কঠিন।
তখন সমিষ্ট ডেলয়েটে (Deloitte) কাজ করা এক তরুণ কনসালট্যান্ট। যা কিছু পাওয়া যাচ্ছিল, সবই আমদানি করা। ভারতে তৈরি কিছুই ছিল না। গাছগাছড়া-জড়িবুটি ভিত্তিক চিকিৎসার (Plant-based Medicine) দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এই ফাঁকটা চোখে পড়ার মতো ছিল।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই পরে জন্ম দেয় কিউরিস্ট (Qurist)-এর। ভারতের একটি ঘরোয়া মেডিক্যাল গাঁজা কোম্পানি। আজ তারা ব্যথা (Pain Management), উদ্বেগ কমানো (Stress Relief), ঘুমের সমস্যা (Sleep Disorders) এমনকী পোষ্য প্রাণীর জন্যও প্রায় ১৫টি পণ্য বিক্রি করছে। সমিষ্ট একা নন। তাঁর মতো আরও অনেক নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা এখন ধীরে ধীরে, বৈজ্ঞানিকভাবে এবং আইনের মধ্যে থেকেই মেডিক্যাল গাঁজাকে (Medical Marijuana) ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল স্রোতে নিয়ে আসছেন।
দীর্ঘদিন ধরে আইনি অস্পষ্টতা (Legal Ambiguity), সামাজিক বিষনজর (Social Stigma) আর ‘নেশার দ্রব্য’-এর সঙ্গে নাম জড়িয়ে যাওয়ার ভয় চিকিৎসক ও সংস্থাগুলিকে দূরে রেখেছিল। রোগীরাও ভুগছিলেন সীমিত বিকল্পে। কিন্তু গত ১২–১৮ মাসে পরিস্থিতি বদলেছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা, প্রাকৃতিক ভেষজ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার (Ayurvedic Medicine) প্রতি আগ্রহ এবং নিয়ম-কানুন স্পষ্ট হওয়ায় মেডিক্যাল গাঁজার চাহিদা হঠাৎ বেড়েছে।
“খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাজার অনেকটা বড় হয়েছে,” জানালেন যশ কোটাক, বম্বে হেম্প কোম্পানি (Bombay Hemp Company এবং Boheco)-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, আগামী দুই-তিন বছরে আমরা আরও বৃদ্ধির আশা করছি।
এই সংস্থার (Boheco) এখন প্রায় ৩৯টি পণ্য রয়েছে— ব্যথা, ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ (Anxiety), গ্যাস্ট্রো সমস্যা, এমনকী যৌন স্বাস্থ্যের (Sexual Health) জন্যও। ট্যাবলেট, তেল, স্প্রে, মলম, মিন্ট—সবই আছে। পাশাপাশি ত্বক, চুল ও পুষ্টির জন্য ওভার-দ্য-কাউন্টার প্রোডাক্টও মিলছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন ঘুমের সমস্যায় ভোগা মানুষ, দীর্ঘদিনের ব্যথায় ভোগা রোগী,
উদ্বেগে ভোগা মানুষ এবং ক্যানসার রোগীরা (Cancer Patients)।
সমিষ্টের কাজ মূলত দিল্লির বড় হাসপাতাল—এইমস (AIIMS), ম্যাক্স (Max), আর্টেমিস (Artemis)-এর অঙ্কোলজিস্ট ও নিউরোলজিস্টদের সঙ্গে। অন্যদিকে, হেম্পস্ট্রিটের (HempStreet) অভিষেক মোহন ভারতে গবেষণা চালিয়ে আমেরিকা (US), ব্রাজিল (Brazil), থাইল্যান্ড (Thailand)-এর বাজারে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমরা ডাইসমেনোরিয়া (Dysmenorrhea) বা তীব্র মাসিক যন্ত্রণার মতো নির্দিষ্ট সমস্যার ওষুধ বানাচ্ছি, বলেন তিনি।
ভারতে এনডিপিএস অ্যাক্ট (NDPS Act) অনুযায়ী গাঁজার ফুল (Ganja) ও চরস (Charas) নিষিদ্ধ।
কিন্তু পাতা, বীজ ও ফাইবার বৈধ— এগুলিই মেডিক্যাল গাঁজা ওষুধ কোম্পানিগুলি ব্যবহার করে। মূলত দুটি উপাদান ব্যবহৃত হয়— CBD (Cannabidiol) যাতে নেশা হয় না। THC (Tetrahydrocannabinol) নেশা হয়, তাই খুব কম মাত্রায় অনুমোদিত। কোটাক বলেন, আমরা ফুল বা চরস ব্যবহার করি না। সব কিছু পাতা থেকে নির্যাস বের করা হয়।
ক্যানাবিস অয়েল (Cannabis Oil) সাধারণত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। ১,০০০–৩,০০০ mg তেলের দাম প্রায় ১,৫০০–৪,৫০০ টাকা। উচ্চ ক্ষমতার তেল ৭,০০০–১২,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া ক্যাপসুলও জনপ্রিয় হচ্ছে। সবকটাই বিক্রি হয় ডাক্তারি পরামর্শে (Doctor Prescription), অনলাইন ও অফলাইন—দু’ভাবেই।
এখন পোষ্য প্রাণীর (Pet Care) জন্যও ক্যানাবিস-ভিত্তিক ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে—আর্থ্রাইটিস, দুশ্চিন্তা এমনকী মৃগী রোগের (Epilepsy) জন্য। বিশ্বে একটি ক্যানাবিস-ভিত্তিক ওষুধই এখন দুই ধরনের বিরল শিশু মৃগী রোগের একমাত্র অনুমোদিত চিকিৎসা।
আসলে এটা নতুন কিছু নয়। আয়ুর্বেদে (Ayurveda) গাঁজার ব্যবহার শতাব্দীপ্রাচীন। আজ আধুনিক বিজ্ঞান আর নিয়ন্ত্রিত ডোজ সেই পুরনো জ্ঞানকেই নতুনভাবে ব্যবহার করছে। এখনও বিনিয়োগ (Funding) কঠিন, তবে রতন টাটা (Ratan Tata)-র মতো নাম এই ক্ষেত্রকে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছে।
দীর্ঘদিনের ব্যথা, ঘুমহীন রাত, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্লান্ত মানুষদের কাছে মেডিক্যাল ক্যানাবিস আর প্রান্তিক ধারণা নয়। পুরনো ঐতিহ্য, আধুনিক বিজ্ঞান আর আইনি কাঠামোর ভরসায় ভারতের চিকিৎসা জগতে ধীরে হলেও স্থায়ী জায়গা করে নিচ্ছে এই বিকল্প চিকিৎসা।