হিন্দিকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ‘বাধ্যতামূলক’ না করে ‘সাধারণত পঠিত’ ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করল মহারাষ্ট্র। অর্থাৎ কেউ না চাইলে হিন্দি ভাষা নিজের পছন্দে না-ও রাখতে পারে। বাংলার অবস্থান কোথায়?

হিন্দি শেখা কি জরুরি?
শেষ আপডেট: 18 June 2025 12:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শিক্ষানীতিতে বড় বদল ঘটিয়ে মহারাষ্ট্রের সরকার ঘোষণা করেছে, হিন্দি আর বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা নয় স্কুল স্তরে। এটি এখন ‘সাধারণত পঠিত’ ভাষা হিসেবেই রাখা হবে সিলেবাসে। এই সিদ্ধান্তে আবারও সামনে এল মাতৃভাষা বনাম কেন্দ্রীয় ভাষার বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে— মহারাষ্ট্র পারলেও, বাংলা এখনও কেন তার প্রাপ্য গুরুত্ব পায় না নিজ রাজ্যে, সেখানে কেন হিন্দি এখনও রয়েছে?
মঙ্গলবার মহারাষ্ট্র সরকারের স্কুল শিক্ষা বিভাগ নতুন বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, রাজ্যের সব মারাঠি ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত হিন্দি ‘বাধ্যতামূলক’ থাকবে না। যদিও তৃতীয় ভাষা হিসেবে এটি ‘সাধারণত শেখানো হবে’। তবে ছাত্রছাত্রীরা চাইলে অন্য ভাষাও বেছে নিতে পারবে।
এই নতুন সিদ্ধান্ত এসেছে এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে, যেখানে হিন্দিকে বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা করা হয়েছিল। সেই নির্দেশিকার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায় বিরোধী মহা বিকাশ আগাড়ি জোট এবং এমনকি বিজেপি-সমর্থক মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনাও।
বিষয়টি আবারও 'হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া' বিতর্ক উস্কে দেয়, যেখানে বহু অ-হিন্দিভাষী রাজ্য দাবি করে যে হিন্দিকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে তাদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই বিতর্কের জেরে মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মহারাষ্ট্র সরকার পিছু হটে। শিক্ষা মন্ত্রী দাদা ভূসে জানান, সিদ্ধান্তটি স্থগিত রাখা হয়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ ঘোষণা করেন— 'শুধু মারাঠি ভাষাই বাধ্যতামূলক হবে।'
তবে মঙ্গলবারের সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে, হিন্দিকে আবারও ‘সাধারণত শেখানো ভাষা’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও বলা হয়েছে, একটি শ্রেণিতে অন্তত ২০ জন ছাত্রছাত্রী অন্য ভাষা পড়তে চাইলে, স্কুল সেই ভাষাটি শেখানোর ব্যবস্থা করবে। যদি শিক্ষক না পাওয়া যায়, তাহলে অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে পড়ানো হবে।
এই ‘২০ জনের শর্ত’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদরা। মহারাষ্ট্র মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন সভাপতি বসন্ত কালপান্ডে বলেন, 'এই সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। শিক্ষক অনলাইনে দেওয়ার কথাও অন্য ভাষার প্রতি উৎসাহ কমানোর চেষ্টা। ছোটদের পক্ষে মারাঠি ও হিন্দির মতো একই লিপি শেখা যথেষ্ট কষ্টকর।'
মূলত, ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির (NEP 2020) আওতায় তিন-ভাষা নীতির অংশ হিসেবেই এই ধারা চালু করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এটি শিক্ষার্থীদের অন্য রাজ্যে গিয়ে পড়াশোনা বা কাজ করার জন্য উপযোগী হবে।
তবে অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোর মধ্যে বিশেষত তামিলনাড়ু বরাবর এই নীতির বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, দুই ভাষার নীতি (তামিল ও ইংরেজি) বেশ সফলভাবে চলছে, এবং কেন্দ্রীয় চাপেই হিন্দিকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে চাপানো হচ্ছে।
এই বিতর্কে বাংলার নাম সরাসরি নেই, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে। বাঙালি ছাত্রছাত্রীরা নিজের রাজ্যেই বাংলা ভাষা শেখার যথাযথ সুযোগ ও গুরুত্ব কতটা পাচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। বহু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে বাংলাকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং যার জেরে বাস্তবে বাংলা শিক্ষার মান ও গুরুত্ব ক্রমশ কমছে।
মহারাষ্ট্র যেখানে একের পর এক নীতিগত পদক্ষেপে মাতৃভাষা মারাঠিকে কেন্দ্রে রাখতে চাইছে, সেখানে বাংলা নিজের ঘরেই কতটা সুরক্ষিত, সেটাই এখন আলোচনার বিষয়।