
মাদ্রাজ হাইকোর্ট।
শেষ আপডেট: 28 December 2024 14:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীকে যৌন হেনস্তার অভিযোগের ঘটনায় শনিবার বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করল মাদ্রাজ হাইকোর্ট। একইসঙ্গে নির্যাতিতা ছাত্রীকে অন্তর্বর্তীকালীন ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিল হাইকোর্ট। সোমবার আন্না বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এক ছাত্রীকে যৌন নিগ্রহ করা হয়। সেই ঘটনার তদন্তে মহিলা আইপিএস অফিসারদের নিয়ে সিট গঠনের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
শনিবার এক বিশেষ শুনানিতে আদালত বলেছে, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে বহু গাফিলতি নজরে এসেছে। যা নিয়ে তদন্ত করবে সিট। আমরা আশা করি, এই তদন্তকারী দল অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সবদিক খতিয়ে দেখে দ্রুত চার্জশিট দাখিল করবে। এই ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত কোনও ব্যক্তিকে ছাড় দেওয়া হবে না। তা সে যে পদাধিকারী কিংবা মর্যাদারই হোক না কেন।
এফআইআর ফাঁস হওয়ার বিষয়টিকেও আদালত গুরুতর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে এবং তদন্ত করবে। এক্ষেত্রে পুলিশের মারাত্মক গাফিলতি রয়েছে বলে মনে করে দুই সদস্যের বেঞ্চ। নির্যাতিতা ছাত্রীকে এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যা এফআইআর ফাঁস হয়ে যাওয়ার পিছনে যুক্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। আদালত এও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই ক্ষতিপূরণের অর্থ এই নয় যে, নির্যাতিতা ছাত্রী ফৌজদারি মামলায় ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবে না। তার জন্যও রাস্তা খোলা রেখেছে হাইকোর্ট।
ছাত্রী সমস্ত ভয় দূর করে অভিযোগ জানানোয় তাঁর প্রশংসা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আদালত বলে, তারা যেন পড়ুয়ার কাউন্সেলিংয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর সঙ্গে ছাত্রীর টিউশন ফি, হস্টেল ফি, এক্সাম ফি, বিবিধ ফি মকুব করে তার সম্পূর্ণ পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়, সেই নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। রাজ্য পুলিশের ডিজিকে ওই ছাত্রী ও তাঁর পরিবারের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে নির্দেশে।
গত শুক্রবার আদালত বলেছিল, ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রে কোনও মেয়ের উপর দোষ চাপানো যায় না। আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীকে যৌন হেনস্তার অভিযোগে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা গ্রহণ করে শুক্রবার এই মৌখিক বার্তা দিয়েছিল মাদ্রাজ হাইকোর্ট। চেন্নাইয়ের আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষের এক ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রীকে যৌন হেনস্তার অভিযোগ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই রাজ্যে রাজনৈতিক জলঘোলা চলছে। বিরোধী দল বিজেপি এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে জোরদার আন্দোলন চালাচ্ছে। যা নিয়ে শাসকদল ডিএমকে খানিকটা হলেও অস্বস্তিতে পড়েছে।
শুক্রবার এই ঘটনার সিবিআই তদন্ত চেয়ে গুচ্ছ আবেদনের শুনানিতে হাইকোর্ট মৌখিক পর্যবেক্ষণে বলে যে, যখন ঘটনাটি ঘটেছে তখন মেয়েটি তার ছেলে বন্ধুর সঙ্গে ছিল নির্যাতিতার ঘাড়ে দায় চাপানো যায় না। কেউ তার উপর দোষ চাপাতে পারে না। আদালতের মৌখিক পর্যবেক্ষণ হল, এই ঘটনাটি ঘটেছে বলে কেউ মেয়েটির দিকে আঙুল তুলে বলতে পারে না যে, সে তখন পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে বসেছিল।
মাদ্রাজ হাইকোর্টের বেঞ্চ আরও বলে, এটা মেয়েটির ব্যক্তিগত অধিকার। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অথবা কোনও ব্যক্তি বলতে পারে না যে, মেয়েরা রাতে বেরতে পারবে না, বা বেরনো উচিত নয়। ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে কথা না বলাই উচিত ইত্যাদি। এটা মেয়েদের ব্যক্তিগত অধিকার। মেয়েদের উপর কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নীতি পুলিশের কাজ করতে পারে না।
বিচারপতি এসএম সুব্রহ্মণ্যম ও বিচারপতি ভি লক্ষ্মীনারায়ণের বেঞ্চ শুনানিতে রাজ্য সরকার ও পুলিশের কঠোর সমালোচনা করে। এফআইআর কী করে প্রকাশ্যে এল, তা নিয়ে জবাব চায় আদালত। আদালত বলেছে, নির্যাতিতা বা অভিযোগকারিণীর নাম ও মোবাইল ফোন নম্বর সহ ব্যক্তিগত তথ্য বাইরে এল কী করে? রাজ্যকে নিশ্চিত করতে হবে যে বা যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে, মেয়েটির এবং তাঁর পরিবারের পরিচয় প্রকাশ্যে এসে পড়ায় তাঁদের এখন ক্রমাগত ফোন আসছে। যাতে তাঁরা অস্বস্তিতে পড়ছেন। তাঁদের উপর মানসিক চাপ আরও বাড়ছে। রাজ্য সরকারি আইনজীবীকে আদালত মুখে মুখে বলেছে, এফআইআর আপনাদের হাত থেকে ফাঁস হয়েছে। আপনাদের এফআইআরকে এমনভাবে রাখা উচিত ছিল, যাতে তা ফাঁস না হয়। এখন কে এর দায় নেবে, প্রশ্ন বেঞ্চের। এর জন্য শুধু অভিযুক্ত একা নয়, রাজ্যও দায়ী। কোনওভাবে নির্যাতিতার পরিচয় যাতে ফাঁস না হয়, তার জন্য নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা থাকা উচিত। যদি এফআইআর আপলোড করা হয়, তাহলেও বিস্তারিত বিবরণ ঢেকে রাখা উচিত, মনে করে আদালত।
একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের নিরাপত্তা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সিসি ক্যামেরা বিকল হয়ে পড়ে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিচারপতিরা বলেছেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় হল পড়ুয়াদের অভিভাবক। সেই হিসেবে নিজের সন্তানদেরই নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। আপনারা কী করছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রশ্ন তুলে আদালত বলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭০টি ক্যামেরার মধ্যে ৫৬টি চলে না, জানতেন না আপনারা? আপনারা কীভাবে বাচ্চাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবেন?
আদালত তুলোধনা করে বলে, পুলিশ কমিশনার প্রেস কনফারেন্স করে বলছেন, এই ঘটনায় মাত্র একজন অভিযুক্ত রয়েছে। তাঁকে এরকম সিদ্ধান্তে আসার অধিকার কে দিয়েছে? রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেলকে আদালত বলে, কোন সার্ভিস রুল এবং অন্যান্য আইনে এই ক্ষমতা দেওয়া আছে তা আমাদের দেখাবেন। কমিশনার এরকম কথা বলার অর্থ তাঁর অধস্তন তদন্তকারী অফিসারকে আর তদন্ত করার প্রয়োজনই পড়বে না বলা ভালো তিনি করতেও সাহস করবেন না! কমিশনার কী করে প্রেসমিট ডাকতে পারেন, বোঝান আমাদের।