স্বাস্থ্য কর্তারা জানাচ্ছেন, এমন গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। কিন্তু গাফিলতির বিরুদ্ধে নেওয়া এই ব্যবস্থাগুলিও এসেছে অনেক দেরিতে।

অপুষ্টিতে শিশুর মৃত্যু
শেষ আপডেট: 22 October 2025 17:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সরকারি দাবি আর বাস্তব চিত্রের ব্যবধান ফের নগ্ন হয়ে পড়ল। অসংখ্য পুষ্টি প্রকল্প, কোটি কোটি টাকার বাজেট, শিশুদের সুরক্ষায় গড়া অসংখ্য পরিকল্পনা - সব ব্যর্থ এক শিশুর মৃত্যুর কাছে (child death)। মধ্যপ্রদেশের (Madhya Pradesh) সৎনা জেলার মারওয়া গ্রামে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল মাত্র চার মাসের হুসেন রেজা। মঙ্গলবার গভীর রাতে জেলা হাসপাতালে সে মারা যায়। কারণ, অপুষ্টি (malnutrition)।
পিকিউ (PICU)-তে টানা চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছিল হুসেন। তার কঙ্কালসার দেহ, হাড়ের ওপর শুধু চামড়ার পরত, আধখোলা চোখ আর বিবর্ণ ঠোঁট যেন এক অবহেলার নিঃশব্দ দলিল। চিকিৎসকদের মতে, হুসেনের ওজন ছিল মাত্র আড়াই কিলোগ্রাম, যেখানে ওই বয়সে সুস্থ শিশুর ওজন অন্তত পাঁচ কিলোগ্রাম হওয়া উচিত। এতটাই দুর্বল ছিল সে যে, কেঁদে নিজের কষ্ট প্রকাশ করার মতো শক্তিটুকুও শরীরে অবশিষ্ট ছিল না।
গত শনিবার ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন মা আসমা বানো। শিশু চিকিৎসক সন্দীপ দ্বিবেদী প্রথমবার যখন শিশুটিকে দেখেন, তিনিও নড়েচড়ে বসেন। দ্রুত তাকে পরীক্ষা করে ঘোষণা করা হয় ‘গুরুতর অপুষ্টিগ্রস্ত’। প্রথমে পাঠানো হয় নিউট্রিশন রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে, পরে স্থানান্তর করা হয় পিকিউ-তে। চার দিন ধরে চিকিৎসকরা প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও হুসেনের অবস্থা আর ফিরিয়ে আনা যায়নি।
হাসপাতালের নথিতে জানা যায়, জন্মের সময় (২ জুলাই) তার ওজন ছিল তিন কিলোগ্রাম। কিন্তু জন্মের পরপরই নিউমোনিয়া হয়ে মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়ে। ওজন বাড়ার বদলে ক্রমে আরও কমতে থাকে। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য - হুসেনের জন্মের পর থেকে একটিও টিকা পায়নি। ফলে তার দুর্বল শরীর আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
হুসেনের মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য দফতর ব্যবস্থা নিয়েছে তিন কর্মীর বিরুদ্ধে। মেডিক্যাল অফিসার এস.পি. শ্রীবাস্তব, হেলথ ওয়ার্কার লক্ষ্মী রাওয়াত ও আশা কর্মী উর্মিলা সৎনামির বিরুদ্ধে নোটিস জারি হয়েছে। অভিযোগ, তাঁরা সময়মতো শিশুর অবস্থার খবর রাখেননি, হাই রিস্ক কেস হিসেবে শনাক্তও করেননি।
চিত্রদুর্গার স্বাস্থ্য কর্তারা জানাচ্ছেন, এমন গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। কিন্তু গাফিলতির বিরুদ্ধে নেওয়া এই ব্যবস্থাগুলিও এসেছে অনেক দেরিতে। হুসেনের মৃত্যু ফের একবার তুলে ধরল গ্রামের স্তরে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ভাঙন, অঙ্গনওয়াড়ি নজরদারির ব্যর্থতা এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা।
আরও ভয়াবহ বিষয় হল, এই ঘটনাটি ব্যতিক্রম নয়। অগস্ট মাসে শিবপুরিতে ১৫ মাস বয়সি দিব্যাংশি নামে এক কন্যাশিশু মারা যায়, তার ওজন ছিল মাত্র ৩.৭ কিলোগ্রাম। তার আগে, শেওপুরে মৃত্যু হয় দেড় বছরের রাধিকার, ওজন ছিল মাত্র ২.৫ কিলোগ্রাম - যেখানে সেই বয়সে শিশুর গড় ওজন হওয়া উচিত ১০ থেকে ১১.৫ কিলোগ্রাম। জুলাইয়েও ভিন্ধ জেলায় একইরকম মৃত্যু হয়েছিল, পরিবারের দাবি ছিল - অপুষ্টিই কারণ। প্রতিটি ঘটনায় দায় চাপানো হয়েছে ‘সিস্টেম ফেইলিওর’-এর উপর।
রাজ্য বিধানসভায় পেশ করা সরকারি তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে জুন ২০২৫-এর মধ্যে রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন ব্লকগুলির নিউট্রিশন রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে ভর্তি হয়েছে ৮৫,৩৩০ শিশু। প্রতিবছর ভর্তি সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২০-২১ সালে ১১,৫৬৬ থেকে ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ২০,৭৪১। বর্তমানে মধ্যপ্রদেশে এক মিলিয়নেরও বেশি শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, তার মধ্যে ১.৩৬ লক্ষ শিশুর অবস্থা ‘গুরুতর বিপজ্জনক’ পর্যায়ে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে সারা দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে মারাত্মক ও মাঝারি অপুষ্টির গড় হার ছিল ৫.৪০ শতাংশ। মধ্যপ্রদেশে সেই হার দাঁড়িয়েছে ৭.৭৯ শতাংশে। আরও উদ্বেগজনক, রাজ্যের ৫৫ জেলার মধ্যে ৪৫টিই কেন্দ্রীয় তথ্য অনুযায়ী ‘রেড জোন’-এ, যেখানে ২০ শতাংশেরও বেশি শিশু বয়স অনুযায়ী অতি কম ওজনের।
সরকারি হিসেবে, এনআরসি কেন্দ্রে প্রতি শিশুর জন্য বরাদ্দ ৯৮০ টাকা, অঙ্গনওয়াড়িতে প্রতিদিন প্রতিটি শিশুর জন্য খরচ ৮ টাকা এবং গুরুতর অপুষ্ট শিশুর জন্য ১২ টাকা। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রকল্পের সুফল শিশুদের কাছে পৌঁছচ্ছে না, তারা হারিয়ে যাচ্ছে প্রশাসনিক ফাঁকফোকরে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের বিরোধী দল কংগ্রেসের বিধায়ক বিক্রান্ত ভুরিয়ার এক প্রশ্নের জবাবে বিধানসভায় সরকার অপুষ্টি দূরীকরণে দিনপ্রতি বরাদ্দের কথা জানানোর পরেই পিলে চমকে গিয়েছে সকলের।
ভুরিয়া বিধানসভায় বলেন, অপুষ্টিতে ভোগা বাচ্চাদের জন্য সরকার দিনে ৮-১২ টাকা খরচ করে। সেখানে দিনপ্রতি গোখাদ্যের বরাদ্দ রয়েছে ৪০ টাকা। দুধের দাম ৭০ টাকা লিটার। একজন সরকারি আমলা একটি বৈঠকের জন্য ভাজাভুজি ও শুকনো ফলেই খরচ করেন হাজার হাজার টাকা। কিন্তু, হাড়ের গায়ে চামড়া লেগে থাকা বাচ্চাদের জন্য সরকার মাত্র ১২ টাকা বরাদ্দ করে রেখেছে।
রাজ্যের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী নির্মলা ভুরিয়াও মেনে নিয়েছেন অপুষ্টি প্রতিরোধে তেমন কোনও বরাদ্দ নেই। আমরা কেন্দ্রের কাছে আরও অর্থ সাহায্যের আর্জি জানিয়েছি। অন্য রাজ্যগুলিও অপুষ্টি দূরীকরণে অনুদান বৃদ্ধির আবেদন করেছে বলে জানান মন্ত্রী।