
শেষ আপডেট: 3 February 2024 20:35
অমল সরকার
অটল বিহারী বাজপেয়ীর পর লালকৃষ্ণ আডবাণীকেও ‘ভারতরত্ন’ সম্মান দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। শনিবার প্রধানমন্ত্রী নিজেই এক্স হ্যান্ডেলে এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। পরে ওডিশার সম্বলপুরের সভায় এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদবাণীজির এই সম্নানপ্রাপ্তি আমার কাছে এক আবেগতাড়িত মুহূর্ত। এর আগে, ২০১৫ সালে আডবাণীর মতোই বিজেপির আর এক প্রতিষ্ঠাতা নেতা, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে এই সম্মান দেয় মোদী সরকার।
আডবাণী ১৯৯১-এ লোকসভার সদস্য হওয়ার আগে টানা তিনবার রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন। প্রথমবার লোকসভার সদস্য হন দিল্লি থেকে। তারপর ১৯৯৮ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত টানা পাঁচবার ছিলেন গুজরাতের রাজধানী গান্ধী নগরের সাংসদ।
প্রতিবার তাঁর নিরাপদ জয়ের পিছনে যে মানুষটির অবদান এই প্রবীণ নেতা আলাদা করে উল্লেখ করেছেন, তিনি নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী। আজকের প্রধানমন্ত্রীর আরএসএসের সাধারণ প্রচারক থাকার সময় থেকে জাতীয় স্তরের নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণীর সঙ্গে পরিচয়।
ক্রমে দু’জনের মধ্যে এতটাই ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় যে ১৯৯০-এ আডবাণী তাঁর রামরথ যাত্রায় ছায়াসঙ্গী হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদীকেই। গুজরাতের সোমনাথ মন্দির চত্ত্বর থেকে অযোধ্যা অভিমুখে রওনা হওয়া সেই রথকে বিহারে লালুপ্রসাদ যাদবের পুলিশ আটক করার মুহূর্তে আডবাণীর পাশে পাশে ছিলেন মোদী। ক্রমে মোদী ও আডবাণীর গুরু-শিষ্য সম্পর্ক সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপি’তে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
১৯৯০-এ রামরথে আদবাণী। পাশে নরেন্দ্র মোদী
আবার সেই সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরিও ছিল বিশেষ আলোচ্য। একটা সময় বলা হত, গুজরাতে বিজেপির জমিতে মোদীর পায়ের তলায় মাটি যত শক্ত হয়েছে, ততই আডবাণী তাঁর থেকে দূরে সরে গিয়েছেন। শেষে দু’জনের সম্পর্কের শীতলতা এমন জায়গায় পৌঁছায় যে নিজের সংসদীয় কেন্দ্র গান্ধী নগরে বছরে এক-দু’বারের বেশি যেতেন না। যদিও গুজরাত দাঙ্গার সময় মোদীকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরানোর দাবি এবং প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ঢাল হয়েছিলেন আডবাণীই। প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী নিজে রাজধর্ম পালন করতে চেয়ে মোদীকে সরাতে চাইলেও বাদ সাধেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আডবাণী। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা আডবাণীর বেশিরভাগ পরামর্শই বাজপেয়ী গ্রহণ করতেন। বাধ্য হয়ে সেবার মোদীকেই রাজধর্ম পালনের পরামর্শ দিয়ে দায় সারেন বাজপেয়ী। সেই দাঙ্গার ঘটনায় নরেন্দ্র মোদীকে ভিসা দিতে অস্বীকার করায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছলেন আডবাণীই। তারপরও মোদী-আডবাণী সম্পর্ক ক্রমে তলানিতে ঠেকে।
বলা হত, সেই পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণভাবেই নরেন্দ্র মোদীর তৈরি। কারণ, লালকৃষ্ণ আডবাণীর লৌহপুরুষ ভাবমূর্তিকেই মোদী তাঁর প্রতিপক্ষ মনে করতেন। মোদী নিজে সেই ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সচেতনভাবে অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং বুঝেছিলেন দলে একজনই মাত্র লৌহপুরুষ থাকতে পারে। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয় ২০১৪-র লোকসভা ভোটে দলের প্রতিষ্ঠাতা নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণীকে দল আর প্রধানমন্ত্রী মুখ না করায়। পরিবর্তে দল বেছে নেয় নরেন্দ্র মোদীকেই।
সুষমা স্বরাজ, অরুণ জেটলি, নীতিন গডকড়িদের দিয়ে চেষ্টা করেও আদবাণী সেই সিদ্ধান্ত আটকাতে পারেননি নাগপুরকে পাশে না পাওয়ায়। মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবিদার পাকিস্তানের জন্মদাতা মহম্মদ আলি জিনহা’কে ধর্মনিরপেক্ষ নেতা বলায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের নেতারা রুষ্ট ছিলেন আদবাণীর উপর।
ক্রমে আডবাণী, মুরলি মনোহর যোশীদের মতো দলে প্রাতঃস্মরণীয় নেতাদের মার্গদর্শকমণ্ডলীর সদস্য করে বস্তুত নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ায় মোদী-আদবাণী সম্পর্ক ঘিরে নেতিবাচক ধারণা আরও দানা বাঁধে।
শনিবার সেই প্রবীণ বিজেপি নেতা বয়সের ভারে ন্যুজ লালকৃষ্ণ আডবাণীকে ‘ভারতরত্ন’ সম্মানজ্ঞাপনের কথা ঘোষণা করে নরেন্দ্র মোদী আসলে এক ঢিলে অনেকগুলি ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্য করতে চাইলেন।
পার্টি এবং পার্টি বাইরে ‘মোদী-শাহের বিজেপি’ কথাটি যেমন বহুল প্রচসলিত, তেমনই এই অভিযোগও মান্যতা পেয়ে গেছে যে দলে প্রবীণেরা ব্রাত্য এবং নানাভাবেই অসম্মানের শিকার। শনিবার আডবাণীকে ‘ভারতরত্ন’ ঘোষণা করে মোদী সেই ধারণা ভাঙার চেষ্টা করলেন। বুঝিয়ে দিলেন দলের জন্য ঘাম-রক্ত ঝরানো নেতাদের তিনি সম্মান করেন। আরও বোঝাতে চাইলেন, উপেক্ষা, অসম্মান করেন না তাঁর সমালোচকদেরও। এমনকী তাঁদেরও নয়, যাঁরা চাননি তিনি প্রধানমন্ত্রী হোন।
দু’ বছর আগে উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংহকে মরণোত্তর বঙ্গবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করেছে মোদী সরকার। নরেন্দ্র মোদীর ঘোর সমালোচক ছিলেন কল্যাণ। সেই তিনি ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার দিনে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্নান দিয়ে মোদী বুঝিয়ে দেন হিন্দুত্ব পুনরুদ্ধারের নামে অন্য ধর্মের উপাসনাস্থল গুড়িয়ে দেওয়াকেও তিনি ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না।
বাবরি ধ্বংসের সেই অভিযানে সামনের সারিতে ছিলেন আডবাণী। সেই ঘটনার মামলায় সিবিআইয়ের চার্জশিটে কল্যাণের পাশাপাশি আডবাণীরও নাম ছিল, প্রমাণের অভাবে যে অভিযোগ থেকে নিম্ন আদালত সব আসামীকেই নির্দোষ ঘোষণা করেছে। আডবাণী যদিও অনেক পরে বাবরি ধ্বংসের ঘটনার নিন্দা এবং দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। তাতে অবশ্য তাঁর হিন্দুত্বের এজেন্ডার প্রতি আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।
অযোধ্যায় সদ্য বহু কাঙ্খিত রাম মন্দিরের উদ্বোধন করে মোদী গোটা দেশে হিন্দুত্বের নয়া বাতাস বইয়ে দিয়েছেন যা তাঁকে ২০২৪-এর ভোট বৈতরণী সহজেই পার করে দেবে বলে রাজনীতির বহু বিশেষজ্ঞ দাবি করতে শুরু করেছেন।
অন্যদিকে, ১৯৮৪ সালের লোকসভা ভোটে দুটি মাত্র আসন পাওয়া বিজেপির পাঁচ বছর পরের ভোটে ৮৫টি আসন প্রাপ্তির পিছনে আডবাণীর অবদান একবাক্যে স্বীকার করে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির। পরের বছর তাঁর রামরথ যাত্রার সুবাদে বিজেপি উচ্চফলনশীল হাইব্রিড শাক-সবজি-ফলমূলের মতো বাড়তে শুরু করে। দলের জন্মের মাত্র ১৬ বছরের মাথায় অটল বিহারী বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পিছনে আডবাণীর ভূমিকা ছিল অনেক বেশি। বাজপেয়ীকে দলের মুখ করা হয়েছিল শরিক দলগুলিকে পাশে পেতে।
তাই আদালতের নির্দেশে অযোধ্যার জমি বিবাদের মীমাংসা এবং রাম মন্দির নির্মাণ আর সেই লক্ষ্যপূরণে তিন-সাড়ে তিন দশক আগে রামরথ ছোটানোকে পাশাপাশি রাখলে হিন্দুত্বে মোদীর তুলনায় আডবাণীর স্ট্রাইক রেট অনেক বেশি। সেই আডবাণীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানের জন্য নির্বাচিত করে মোদী লোকসভা ভোটে তাঁর লক্ষ্যপূরণে হিন্দুত্ববাদী শিবিরকে আরও বেশি করে তাঁর পাশে পাওয়ার চেষ্টা সফল করতে চাইলেন। ২০২৪-এ লোকসভায় চারশোর আসন নিয়ে ফিরতে চান মোদী।
প্রবীণদের সম্মান, মযার্দা দেওয়ার বার্তা নিশ্চিত করার আগে মোদী দলের নবীন নেতৃত্বকেও পাশে টেনে নিয়েছেন। একের পর এক রাজ্যে তিনি নবীন নেতৃত্বকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর সঙ্গে থাকাপ পুরস্কার মিলবেই। কর্নাটক, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, অসম, ত্রিপুরা, উত্তরাখণ্ড, গোয়ার পর হালে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগড়ে তিনি রাজ্য বিজেপির মুখ হয়ে ওঠা প্রভাবশালী নেতাদের মুখ্যমন্ত্রী না করে নবীনদের বসিয়েছেন। আডবাণীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানের জন্য মোদী নির্বাচিত করায় বসুন্ধরা রাজে, শিবরাজ সিং চৌহানের মতো বিক্ষুব্ধ নেতাদেরও এখন কাজ হবে মোদীর লক্ষ্যপূরণে ঝাঁপানো—২৪-এ চারশো পার।