এক আলোচনায় বিচারপতি গাভাই বলেন, বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। কলেজিয়াম ব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে তিনি মত প্রকাশ করেন।

ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্ট আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন ভারতের প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাই।
শেষ আপডেট: 4 June 2025 10:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনআস্থার প্রশ্নে এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাই। ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্ট আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে, বিচারক নিয়োগে সরকারের প্রভাব, কলেজিয়াম ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের উত্তরসূরি।
প্রধান বিচারপতি গাভাই বলেন, 'ভারতে বিচারপতি নিয়োগে কে প্রধান ভূমিকা পালন করবে, এই প্রশ্নটি বহুদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এই নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিত নির্বাহী শাখা। তখন দুইবার ভারতের প্রধান বিচারপতি নিয়োগে সবচেয়ে সিনিয়র বিচারপতিদের উপেক্ষা করা হয়েছিল।'
তিনি আলোচনায় জানান, এই দুই ঘটনাই বিচার বিভাগের ঐতিহ্যবিরোধী ছিল। ১৯৬৪ সালে বিচারপতি সৈয়দ জাফর ইমাম শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিয়োগ পাননি, এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বিচারপতি পিবি গজেন্দ্রগড়করের নাম সুপারিশ করেন। এরপর ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার 'এডিএম জবলপুর বনাম শিবকান্ত শুক্লা' মামলায় মৌলিক অধিকার নিয়ে ভিন্নমত দেওয়ার কারণে বিচারপতি হংসরাজ খান্নাকে উপেক্ষা করে।
এই কথা জানানোর পরে প্রধান বিচারপতি বলেন, 'এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের জবাবে ১৯৯৩ ও ১৯৯৮ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ভারতের প্রধান বিচারপতি ও চারজন জ্যেষ্ঠতম বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত একটি কলেজিয়াম সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে সুপারিশ করবে।'
তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট ‘ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন অ্যাক্ট’ বাতিল করে দেয়। এই আইনটি নির্বাহী শাখাকে বিচারক নিয়োগে প্রাধান্য দিচ্ছিল, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করত।
বিচারপতি গাভাই বিশেষ করে জোর দিয়ে বলেন, 'কলেজিয়াম ব্যবস্থার সমালোচনা হতে পারে, তবে যে কোনও বিকল্প ব্যবস্থাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার শর্ত পূরণ না করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।'
পাশাপাশি, অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের সরকারি পদ গ্রহণ বা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি গাভাই। তিনি বলেন, 'যদি কোনও বিচারপতি অবসরের পরপরই সরকারের সঙ্গে যুক্ত হন, বা বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ান, তা হলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন উঠবে। এতে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়। ভবিষ্যতে কোনও সরকারি পদ পাওয়ার আশায় বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।'
তিনি জানান, 'এই কারণেই আমি এবং আমার অনেক সহকর্মী জনসমক্ষে ঘোষণা করেছি যে, অবসরের পর আমরা কোনও সরকারি পদ গ্রহণ করব না, যাতে করে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষা পায়।'
আন্তর্জাতিক মঞ্চের এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ভারতের বিচারপতি বিক্রম নাথ, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের লেডি চিফ জাস্টিস ব্যারোনেস ক্যার এবং যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জর্জ লেগ্যাট। এই আন্তর্জাতিক আলোচনা পরিসরে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও জনআস্থার প্রশ্নে ভারতের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন প্রধান বিচারপতি গাভাই।
এত বড় মঞ্চের আলোচনায় দেশের অতীতের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা করার পাশাপাশি, বর্তমান বিচার ব্যবস্থার মৌলিকতা রক্ষা নিয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নেন প্রধান বিচারপতি গাভাই। ফলে এই আলোচনা যেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনআস্থার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।