পেরু (Peru) থেকে আয়রন-সমৃদ্ধ আলু (Iron rich potato) আসছে ভারতে (India)। অ্যানিমিয়া ও পুষ্টিহীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি বিশেষভাবে উপযোগী হতে পারে, বিশেষ করে ভারতীয় নারীদের জন্য।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।
শেষ আপডেট: 7 August 2025 15:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আয়রনের ঘাটতি মোকাবিলায় এবার বিশেষ ধরনের পুষ্টিসমৃদ্ধ আলু (Iron fortified Potato) আসছে ভারতীয় বাজারে। এই আলুর উৎস দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু। সেখানকার ইন্টারন্যাশনাল পটেটো সেন্টার (CIP) আয়রন-সমৃদ্ধ এই জৈব-পুষ্টিকর (biofortified) আলু তৈরি করেছে, যা ভারতে আনার জন্য তাদের জার্মপ্লাজম বা জিনগত উপাদান ইতিমধ্যেই হস্তান্তর করা হয়েছে আইসিএআরের অধীনস্থ সেন্ট্রাল পটেটো রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CPRI)-এর কাছে।
ভারতের শিমলার সিপিআরআই ইনস্টিটিউটে এই আলুর জিনগত উপাদান নিয়ে গবেষণা করে দেশীয় মাটি ও জলবায়ুর উপযোগী করে তোলা হবে। তারপর কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে কৃষকদের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক চাষ করে দেখা হবে এর কার্যকারিতা। সফল হলে, এই আয়রন-সমৃদ্ধ আলুর বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথ খুলবে ভারতে।
পেরু থেকে CIP-এর ডিরেক্টর জেনারেল সায়মন হেক বলেন, “আমরা পেরুতে আয়রনের ঘাটতি মোকাবিলার জন্য এই আলুর জাতটি তৈরি করেছি। সেখানকার প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই খুব ভালো। ভারতে এর প্রয়োগ হলে আয়রনের ঘাটতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিহীনতা দূর করতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।”
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আলু?
ভারতে প্রতি বছর আলুর উৎপাদন রেকর্ড হারে বাড়ছে, অথচ মহিলাদের মধ্যে রক্তাল্পতার মাত্রাও উদ্বেগজনক। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (2019-21) অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি প্রায় ৫৭ শতাংশ ভারতীয় মহিলা অ্যানিমিয়ার শিকার। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিহীনতা আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকায়, সহজলভ্য খাদ্যের পুষ্টিগুণ বাড়ানোই এখন মূল লক্ষ্য।
জৈব-পুষ্টিকরণ বা biofortification হল ফসলের মধ্যে প্রাকৃতিক বা জেনেটিক পদ্ধতিতে বিশেষ পুষ্টি উপাদান বাড়ানোর প্রক্রিয়া। সাধারণত প্রচলিত জাতের চেয়ে এই ধরনের আলুতে আয়রনের পরিমাণ ৪০-৮০ শতাংশ বেশি থাকে।
এই আয়রন-সমৃদ্ধ আলু তৈরি করতে CIP ১৬ বছরের বেশি সময় গবেষণা চালিয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে, তারা এই আলুর জাতে এমন বৈশিষ্ট্য যুক্ত করেছে যাতে তা দেরিতে পচন ধরা রোগ (late blight), ভাইরাস সংক্রমণ, উচ্চ তাপমাত্রা ও খরার প্রতিও প্রতিরোধক্ষম হয়।
২০১৮ সালে এই নতুন আলুর ৩০টি ক্লোন পেরুর বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা হয়। এর মধ্যে ৫০টিরও বেশি ক্লোন আফ্রিকা ও এশিয়ার অংশীদার দেশগুলোতে প্রেরণ করা হয়েছে মাঠপর্যায়ে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য।
CIP-এর তৈরি ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ মিষ্টি আলু ইতিমধ্যেই ভারতীয় রাজ্য যেমন ওড়িশা, কর্নাটক, পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদিতে সফলভাবে চাষ হচ্ছে।
আরও গবেষণায় যা উঠে এসেছে—২০২৩ সালে The Journal of Nutrition-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আয়রন-সমৃদ্ধ আলু থেকে আয়রনের শোষণ ক্ষমতা সাধারণ আলুর তুলনায় প্রায় ৪৫.৮ শতাংশ বেশি। গবেষণাটি পেরুর পাহাড়ি অঞ্চলের মহিলাদের উপর চালানো হয়েছিল।
ICAR-এর প্রাক্তন ডিজি এবং বিশিষ্ট জিনতত্ত্ববিদ ত্রিলোচন মহাপাত্র জানিয়েছেন, “ভারতের পুষ্টিহীনতা মোকাবিলায় জৈব-পুষ্টিকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি ইতিমধ্যেই প্রায় ১০০ ধরনের জৈব-পুষ্টিকর ফসল তৈরি করেছে।”
এই আয়রন-সমৃদ্ধ আলু কেবলমাত্র অ্যানিমিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়ক হবে না, বরং ভারতের পুষ্টি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এখন অপেক্ষা এই আলুর মাঠপর্যায়ে সাফল্য দেখার।