খোমেইনির শিকড়ের একাংশ রয়েছে ভারতের মাটিতেও। ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের ছোট্ট শহর বারাবাঁকিতে ছিল তাঁর পূর্বপুরুষদের বসতি।

শেষ আপডেট: 16 June 2025 18:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বর্তমান ইরানের (Iran) ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য নাম আয়াতোল্লা রুহোল্লাহ খোমেইনি (Ayatollah Ruhollah Khomeini)। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি তিনি, যিনি পশ্চিম-সমর্থিত শাহ রাজবংশকে উৎখাত করে ইরানকে পরিণত করেন একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রে। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই খোমেইনির শিকড়ের একাংশ রয়েছে ভারতের মাটিতেও। ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের ছোট্ট শহর বারাবাঁকিতে ছিল তাঁর পূর্বপুরুষদের বসতি।
ভারতের বারাবাঁকি থেকে ইরানের খোমেইন
খোমেইনির দাদু, আহমদ হিন্দি, জন্মেছিলেন উত্তরপ্রদেশের বারাবাঁকির কাছাকাছি এক গ্রামে। তাঁর বাবা দিন আলি শাহ আগে ইরানের কেন্দ্রীয় অঞ্চল থেকে ভারতে এসেছিলেন ১৭০০ সালের দিকে। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর যখন ব্রিটিশ শাসনের প্রভাব বাড়ছিল ভারতে, তখনই এই পরিবারটি বারাবাঁকিতে বসতি গড়ে তোলে।
আহমদ হিন্দি জন্মগ্রহণ করেন আনুমানিক ১৮০০ সালে। সেই সময়ে ভারতের সমাজে ইসলামের পুনর্জাগরণ ও মুসলিমদের অধিকার আদায়ের এক নতুন ধারা দেখা দেয়। আহমদ হিন্দিও সেই ধারার একজন অনুসারী ছিলেন। ইসলামকে আরও গভীরভাবে জানা ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি ১৮৩০ সালে ভারতের পাট চুকিয়ে ইরাকের নাজাফে ইমাম আলি-র সমাধি দর্শনে যান।
এরপর ১৮৩৪ সালে তিনি ইরানের খোমেইন শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তিনি পরিবার গড়েন। তাঁরই সন্তান মোস্তফা, এবং মোস্তফার সন্তান হলেন রুহোল্লাহ খোমেইনি। অর্থাৎ, ভারতের মাটি থেকে যাত্রা শুরু করা আহমদ হিন্দির উত্তরসূরী হয়েই ইরানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেন খোমেইনি।
'হিন্দি' উপাধির তাৎপর্য
আহমদ তাঁর নামের সঙ্গে 'হিন্দি' উপাধি যুক্ত রাখেন, যা তাঁর ভারতীয় শিকড়ের স্মারক হয়ে থাকে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে 'আহমদ হিন্দি' বলেই পরিচয় দিতেন। তাঁর সমাধি রয়েছে কারবালায়। যদিও খোমেইনি তাঁর দাদার সঙ্গে কখনও সাক্ষাৎ করেননি, কিন্তু দাদার বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুশাসন ও আদর্শ তাঁর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। খোমেইনি নিজেও আজীবন শিয়া মতবাদের ধারক ও বাহক ছিলেন।
ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি ও বিশ্ব রাজনীতির পালাবদল
১৯০২ সালে জন্ম নেওয়া রুহোল্লাহ খোমেইনি ইরানের রাজনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব ঘটে, শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পশ্চিম-সমর্থিত রাজতন্ত্রের পতন হয়। ইরান হয়ে ওঠে একটি শিয়া নেতৃত্বাধীন ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাঁর এই বিপ্লব কেবল ইরানের ভেতরেই নয়, বরং গোটা পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য পাল্টে দেয়।
উত্তরসূরি নিয়ে বিতর্ক ও আজকের প্রেক্ষাপট
বর্তমানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনি। কিন্তু তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরি কে হবেন তা নিয়ে দেশটির ভিতরে জল্পনা তুঙ্গে। তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে উত্তরসূরি করার সম্ভাবনা থাকলেও, ইরানে বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের বিরোধিতা করেন খোমেইনি নিজে। তাঁর ভাষায়, এটি ইসলামের পরিপন্থী। খোমেইনির সেই নীতি আজও ইরানের শাসনব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখে।
ভারত-ইরান যোগের নিঃশব্দ স্মারক
ভারতের বারাবাঁকির সেই ছোট্ট গ্রাম হয়তো আজ বিশ্ব মানচিত্রে খুব একটা আলোচনায় নেই। কিন্তু সেই গ্রাম থেকেই যে পরিবারের শিকড় বিস্তার করে একদিন ইরানের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় পৌঁছবে, তা হয়তো কল্পনাও করেননি অনেকেই। ইতিহাসের এই নিঃশব্দ যোগসূত্র দুই দেশের সম্পর্কের অতীত ও বর্তমানের মাঝে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি করে রেখেছে।