১৯৯৩ থেকে ২০২৫ — মুম্বই থেকে পহেলগাম, দেশের নানা প্রান্তে ১০টি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা ও তাদের প্রভাবের চিত্র।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 12 November 2025 20:09
সময়টা যেন থমকে যায়, যখন মনে পড়ে ১৯৯৩ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বারংবার রক্তে ভেসেছে ভারত। মুম্বইয়ের সমুদ্রের ধার থেকে দিল্লির রাজপথ, গুজরাটের ব্যস্ত বাজার থেকে দেশের আনাচে-কানাচে, প্রতিটি বিস্ফোরণ যেন লক্ষ লক্ষ স্বপ্নের উপর নেমে আসা এক নিষ্ঠুর আঘাত। তারিখগুলো এখন আর শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা নয়, সেগুলো যেন একেকটি রক্তাক্ত দীর্ঘশ্বাস। চোখের সামনে প্রিয়জনদের হারিয়ে ফেলার সেই তীব্র যন্ত্রণা, সেই ভয়াবহ ধ্বংসলীলা... প্রতিটি হামলায় মনে হয়েছে বুঝি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ চিরতরে থেমে গেল।
তবু, এই দেশ, এই মানুষ— তারা প্রতিবারই সমস্ত শোক আর ধ্বংসস্তূপের অন্ধকার ভেদ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। কারণ, প্রতিটি ভারতীয়র হৃদয়ে লুকিয়ে আছে একটাই অপ্রতিরোধ্য শপথ, একটাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা “আমরা হার মানব না।”

১৯৯৩: রক্তাক্ত মুম্বই
১২ মার্চ, ১৯৯৩। ভারতীয় ইতিহাসে সেই দিনটি চিরকাল স্মরণীয়, কারণ এটাই ছিল দেশের প্রথম বড়সড় সন্ত্রাসবাদী হামলা। বাণিজ্যনগরী মুম্বইয়ে একের পর এক ১২টি বিস্ফোরণ। মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় গোটা শহর। ২৫৭ জন প্রাণ হারান, আহত ৭১৭।
অভিযুক্তদের তালিকায় উঠে আসে এক নাম, সঞ্জয় দত্ত। বলিউড থেকে রাজনীতি, গোটা দেশই হতবাক। হামলার তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। ঠিক এক বছর পর, ১৯৯৪-এ মুম্বই স্টেশন থেকে ধরা পড়ে মূল চক্রী ইয়াকুব মেমন। মুম্বইয়ের বুকে সেই ভয়াবহ দিন আজও আতঙ্কের প্রতীক।

১৯৯৮: কোয়েম্বত্তূরের কান্না
পাঁচ বছর পর ফের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮। ভালবাসার দিনে রক্তের স্রোত বইল তামিলনাড়ুর সাজানো শহর কোয়েম্বত্তূরে। দুপুর দেড়টা নাগাদ একে একে ১১টি জায়গায় ঘটে ১২টি বিস্ফোরণ। নিহত ৫৮ জন, আহত শতাধিক। হামলার দায় পড়ে মুসলিম উগ্রবাদী সংগঠন আল উম্মাহ-র উপর। শহরের পাথরে পাথরে আজও লেগে আছে সেই বিকেলের আতঙ্ক।

২০০১: একের পর এক গুলি, সংসদে জঙ্গিহানা
১৩ ডিসেম্বর, ২০০১। সংসদ ভবনে ঢুকে পড়ে পাঁচ সশস্ত্র জঙ্গি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ও সংসদের স্টিকার লাগানো গাড়িতে তারা নির্ভয়ে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। সেই সময় সংসদের ভিতরে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আডবাণী ও আরও শতাধিক নেতা। নিহত হন ছ’জন পুলিশ, দু’জন নিরাপত্তারক্ষী এবং পাঁচ জঙ্গি। হামলার দায় স্বীকার করে জইশ-ই-মহম্মদ ও লস্কর-ই-তইবা। গণতন্ত্র কেঁপে উঠেছিল সেদিন।

২০০২: অক্ষরধাম মন্দিরে হামলা, নেমে আসে অন্ধকার
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০২। বিকেল ৫টা। গুজরাতের অক্ষরধাম মন্দিরে ঢুকে পড়ে দুই জঙ্গি। অস্ত্র ও গ্রেনেড নিয়ে শুরু হয় গুলিবৃষ্টি। নিহত হন ৩০ জন, আহত ৮০। অবশেষে ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (NSG)-এর হাতে নিকেশ হয় দুই জঙ্গি। ঘটনার পর সন্দেহভাজন ছয়জনকে গ্রেফতার করে গুজরাত পুলিশ। কিন্তু ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, তারা বেকসুর খালাস।
![]()
২০০৫: দীপাবলির আগে দিল্লিতে একাধিক বিস্ফোরণ
২৯ অক্টোবর, ২০০৫। দীপাবলির ঠিক দু’দিন আগে। উৎসবের আলোর বদলে বিস্ফোরণের আগুনে জ্বলল রাজধানী। সরোজিনী নগর, পাহাড়গঞ্জ, গোবিন্দপুরী তিন জায়গায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণে নিহত ৬২ জন, আহত ২১০। আতঙ্কের শহরে উৎসবের আনন্দ থেমে গেল এক মুহূর্তে।

২০০৬: ফের মুম্বই, এবার ট্রেন বিস্ফোরণ
১১ জুলাই, ২০০৬। সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়। ট্রেনের হুইসেলের সঙ্গে মিশে যায় বিস্ফোরণের শব্দ। মুম্বই লোকাল ট্রেন নেটওয়ার্কে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে প্রাণ হারান ২০৯ জন, আহত ৭০০। দায় স্বীকার করে লস্কর-ই-তইবা ও আল-কায়েদা। শহরের বুকের গভীরে যেন চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায় সেই সন্ধ্যা।

২০০৭: সমঝোতা এক্সপ্রেসে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭। দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক ছিল দিল্লি-লাহৌর সমঝোতা এক্সপ্রেস। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব গলে যায় আগুনে। হরিয়ানার পানিপথের কাছে ট্রেনের দু’টি বগিতে বিস্ফোরণ ঘটে। ৬৮ জন যাত্রীর প্রাণ যায়। এনআইএ জানায়, এই হামলার পেছনেও ছায়া লস্কর-ই-তইবা-র।

২০০৮: ১৩ মে জয়পুর ও ২৬/১১ মুম্বই হামলা
১৩ মে, ২০০৮। মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ৯টি বিস্ফোরণ কাঁপিয়ে দেয় জয়পুর। নিহত ৬৩, আহত ২১৬। আর নভেম্বরেই ভয়ঙ্করতম অধ্যায়, ২৬/১১ মুম্বই হামলা। আজমল কসাবের নেতৃত্বে লস্করের জঙ্গিরা হামলা চালায় আটটি জায়গায়। তাজ হোটেল, ওবেরয় ট্রাইডেন্ট, ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস কোথাও রেহাই নেই। নিহত ১৬৪, আহত ১৬৮। ২০১২ সালে কসাবের ফাঁসির মাধ্যমে শেষ হয় সেই অধ্যায়, কিন্তু স্মৃতি রয়ে যায় চিরস্থায়ী দুঃস্বপ্নের মতো।

২০১৯: পুলওয়ামা অ্যাটাক
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯। যেদিন সারা দেশ ভালবাসা উদ্যাপন করছিল, সেদিন রক্তে ভেসে গেল কাশ্মীরের পুলওয়ামা। এক আত্মঘাতী হামলায় শহিদ হন ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ান। দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কান্না, ক্ষোভ, প্রতিজ্ঞা একসঙ্গে মিশে গিয়েছিল সেই দিন। পাকিস্তানি জঙ্গিদের এই হামলা ভারতের ইতিহাসে চিরকাল থেকে যাবে।
![]()
২০২৫: পহেলগামে জঙ্গি হামলা
এবছরের ২২ এপ্রিল। কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলায় মৃত্যু হয়েছিল ২৬ পর্যটকের। নাম জিজ্ঞাসা করে করে গুলি চালায় তিন সন্ত্রাসবাদী। তারপরে ৭ মে, ভারতীয় সেনা লঞ্চ করে অপারেশন সিঁদুর। সেই অভিযানে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মোট ৯টি জায়গায় জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে নিয়ন্ত্রিত হামলা এয়ার স্ট্রাইক চালানো হয়ে। এর জেরে একাধিক জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেক জঙ্গিরও মৃত্যু হয়।
১৯৯৩ থেকে ২০২৫, এই বত্রিশ বছরে ভারত দেখেছে সন্ত্রাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ। বারবার রক্ত ঝরেছে, কেঁপে উঠেছে শহর, চিৎকার করেছে অসংখ্য পরিবার। রক্তে লেখা সেই ইতিহাস আজও মনে করিয়ে দেয়, শান্তির দাম অনেক সময় রক্ত দিয়েই চোকাতে হয়। আজও যখন দিল্লির লালকেল্লার সামনে বিস্ফোরণে ভারত আরও একবার আঘাত পেল, দেশবাসী একটাই উত্তর দিল—
“আমরা ভাঙব না, আমরা লড়ব...”