৯ বছর পর, ২৫ ফেব্রুয়ারি আবার ইজরায়েল যাচ্ছেন মোদী। বিশ্লেষকদের মতে, সেই ‘প্রাচীর ভাঙা’র মিশন অনেকটাই সফল।

লাল গালিচার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। কয়েক মুহূর্ত পর দু’জনের আলিঙ্গন— ছবিটা তখনই ইতিহাস হয়ে যায়।
শেষ আপডেট: 23 February 2026 16:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১৭ সালের ৪ জুলাই। তেল আবিবের বাইরে বিমানবন্দরে নামলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। লাল গালিচার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। কয়েক মুহূর্ত পর দু’জনের আলিঙ্গন— ছবিটা তখনই ইতিহাস হয়ে যায়। এটাই ছিল কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইজরায়েল সফর। সেদিন মোদী বলেছিলেন, এটা এক নতুন পথের যাত্রা। নেতানিয়াহু মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ২০১৪ সালে নিউ ইয়র্কে প্রথম দেখা হওয়ার সময়ই দু’জনে ঠিক করেছিলেন, ভারত আর ইজরায়েলের মধ্যে যত প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর আছে, সব ভেঙে ফেলবেন।
৯ বছর পর, ২৫ ফেব্রুয়ারি আবার ইজরায়েল যাচ্ছেন মোদী। বিশ্লেষকদের মতে, সেই ‘প্রাচীর ভাঙা’র মিশন অনেকটাই সফল। যে সম্পর্ক একসময় ভারতে চোরাস্রোতে চলত, আজ সেটা প্রকাশ্য বন্ধুত্ব। মোদী বহুবার নেতানিয়াহুকে ‘প্রিয় বন্ধু’ বলেছেন। যদিও ২০২৪ সালের শেষদিকে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
ভারতীয় কূটনীতিকরা বলছেন, এটা বাস্তববাদী কূটনীতি। প্রযুক্তি আর সামরিক দক্ষতায় ইজরায়েলকে উপেক্ষা করা যায় না। পাশাপাশি আরব দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক মজবুত রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এর মূল্য দিতে হয়েছে প্যালেস্তাইনকে। আর ভারতের নৈতিক অবস্থানকেও। দিল্লির এক নীতি বিশ্লেষক আনোয়ার আলমের কথায়, বাস্তববাদী মোড় নেওয়ার ফলে গ্লোবাল সাউথে ভারতের যে নৈতিক মর্যাদা ছিল, সেটা কমেছে। গাজার চলতি যুদ্ধের মাঝে মোদীর সফর ইজরায়েল রাষ্ট্রকে বৈধতা দেওয়ার মতোই দেখাচ্ছে।
এক সময় কিন্তু ভারত ছিল প্যালেস্তাইনের জোরালো সমর্থক। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্যালেস্তাইন ভাগের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল ভারত। ১৯৮৮ সালে আরব দেশ নয়, এমন দেশগুলোর মধ্যে প্রথম দিকে প্যালেস্তাইনকেই স্বীকৃতি দেয় ভারত। ঠান্ডাযুদ্ধের শেষে পরিস্থিতি বদলায়। সোভিয়েত ঘেঁষা অবস্থান থেকে সরে এসে, ১৯৯২ সালে ইজরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে ভারত। তারপর থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাই সম্পর্কের ভিত।
২০১৪ সালে মোদীর ক্ষমতায় আসা ছিল বড় মোড় ঘোরার মুহূর্ত। তাঁর দল ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে দেখার ভাবনায় বিশ্বাসী বলে ইসলামি দেশগুলির বিশ্বাস। অনেকের মতে, সেটা ইজরায়েলের নিজেকে ইহুদি মাতৃভূমি হিসেবে দেখার ধারণার সঙ্গে মিল খুঁজে পায়। দু’দেশই ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’কে বড় হুমকি বলে তুলে ধরে। সমালোচকদের মতে, এই তকমার আড়ালে অনেক সময় ব্যাপক অর্থে মুসলিমবিরোধী নীতিকেও যুক্তিগ্রাহ্য করা হয়। মোদীর আমলে ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র খরিদ্দার হয়েছে ভারত। ২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় সংস্থাগুলি ইজরায়েলে রকেট ও বিস্ফোরক বিক্রি করেছে বলে এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এবারের সফরের আগে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়াতে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও ভাবছে দিল্লি। জেরুজালেমে ইজরায়েলের সংসদে ভাষণ দেওয়ার কথা মোদীর। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর নেতানিয়াহুর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সামনে জাতীয় নির্বাচন। গোয়েন্দা ব্যর্থতা থেকে গাজা যুদ্ধ— সব মিলিয়ে চাপে তিনি। এই সময় মোদীর সফর তাঁর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বাড়াতে সাহায্য করবে। গাজা যুদ্ধের পর পশ্চিমী কিছু নেতা ইজরায়েল গেলেও গ্লোবাল সাউথের নেতাদের দেখা যায়নি তেমন। সেই প্রেক্ষাপটে মোদীর সফর তাৎপর্যপূর্ণ। এক বিশেষজ্ঞের কথায়, এখন ইজরায়েলের খুব বেশি বন্ধু নেই। সেই জায়গায় ভারত একটা বড় ভূমিকা নিচ্ছে।
২০১৭ সালের সফর ছিল মাইলফলক। তার আগে ভারতীয় নেতারা ইজরায়েল গেলে প্যালেস্তাইন সফর জুড়ে দিতেন। মোদী সেই রীতি ভাঙেন। ২০১৭-তে তিনি প্যালেস্তাইন যাননি। পরে ২০১৮-তে আলাদা সফরে যান। সেই সফর ঘিরে সম্প্রতি বিতর্কও হয়েছে। এক কুখ্যাত অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তের ইমেল প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে, মোদীর সফর নাকি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সুবিধার জন্য সাজানো হয়েছিল। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।
তবে সম্পর্কের গভীরতা অস্বীকার করা যায় না। ১৯৯২ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ছিল ২০ কোটি ডলার। ২০২৪ সালে তা ৬০০ কোটি ডলার ছুঁয়েছে। হিরে, পেট্রোলিয়াম, রাসায়নিক— বাণিজ্যের বড় অংশ জুড়ে এগুলো। গত বছর বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তিও সই হয়েছে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। মানুষে মানুষে যোগাযোগও বেড়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইজরায়েল প্যালেস্তাইনিদের কাজ করা বন্ধ করলে হাজার হাজার ভারতীয় নির্মাণ সংস্থায় কাজ করতে নাম লেখান।
মোদী হামাসের হামলার তীব্র নিন্দা করেছিলেন প্রথম দিকেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানকে জোরালো করতেই ভারত-ইজরায়েল সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে দিল্লি। ভারত বারবার অভিযোগ করে, পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গিরা কাশ্মীরে হামলা চালায়। পাকিস্তান অবশ্য রাষ্ট্রীয় মদতের অভিযোগ অস্বীকার করে। তবু দিল্লি প্যালেস্তাইন ইস্যু পুরো ছাড়েনি। দুই রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলে, আলোচনার মাধ্যমে শান্তির পক্ষে সওয়াল করে। তবে গাজায় ইজরায়েলের অভিযানের কড়া সমালোচনায় আগের মতো সরব নয়।
একসময় ভারত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিল। এখন দিল্লি এই নীতিকে বলে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। এক বিশেষজ্ঞের কথায়, পশ্চিম এশিয়াতেই এই নীতি সবচেয়ে ভালো কাজ করছে। ভারত একদিকে ইজরায়েল, অন্যদিকে আরব শক্তি আর ইরান— সবার সঙ্গেই সম্পর্ক রাখছে। কারণ ভারত সরাসরি আঞ্চলিক সংঘাতে জড়ায় না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছে ভারত। চাবাহার বন্দর প্রকল্প নিয়েও গতি কমেছে। এখন আবার ইরানের উপর হামলার হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে ইরানের কাছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, যদি ইরান দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েল বড় শক্তি হিসেবে উঠে আসবে। সেই ভবিষ্যতের কথা ভেবেই হয়তো ভারত নিজের অবস্থান সাজাচ্ছে। পাশাপাশি ইজরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনে প্রভাব ফেলতে পারে— যা দিল্লির জন্য কূটনৈতিকভাবে লাভজনক।