গাজা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ - একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, অন্যদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ঐতিহাসিক সমর্থন। ফলে ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল প্রতীকী নয়, বরং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়া নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

শেষ আপডেট: 13 February 2026 07:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গাজা উপত্যকাকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগে ভারত আপাতত সতর্ক। আমেরিকার তরফে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছে নয়াদিল্লি (Gaza Peace Board invitation)। তবে সেই প্রস্তাব এখনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেই জানাল বিদেশমন্ত্রক (MEA)।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ওয়াশিংটনের তরফে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবিত প্রথম বৈঠকে ভারত যোগ দেবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
“বোর্ড অব পিস (Gaza Board of Peace) প্রসঙ্গে বলতে পারি, মার্কিন সরকারের কাছ থেকে আমন্ত্রণপত্র পেয়েছি। প্রস্তাবটি আমরা বর্তমানে বিবেচনা করছি এবং পর্যালোচনা চলছে,” বলেন জয়সওয়াল।
#WATCH | Delhi: On US President Donald Trump's Board of Peace, MEA spokesperson Randhir Jaiswal says, "We have received an invitation from the US side to join the Board of Peace. We are currently examining the proposal. As you know, India has consistently supported efforts aimed… pic.twitter.com/Urroy87hsd
— ANI (@ANI) February 12, 2026
ভারতের সতর্ক অবস্থান
জয়সওয়াল এ-ও মনে করিয়ে দেন, পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে ভারতের অবস্থান বরাবরই সুস্পষ্ট। “ভারত সবসময় এমন উদ্যোগকে সমর্থন করেছে, যা পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং খোলামেলা আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীও গাজা-সহ গোটা অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত করে, এমন সব প্রয়াসকে স্বাগত জানিয়েছেন,” বলেন তিনি।
তবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই নতুন উদ্যোগে সরাসরি অঙ্গীকারের প্রশ্নে ভারত আপাতত নিরপেক্ষ ও সতর্ক সুরেই কথা বলছে।
কী এই ‘বোর্ড অব পিস’?
‘বোর্ড অব পিস’ গঠিত হয়েছে ইউনাইটেড নেশনস সিকিউরিটি কাউন্সিল (United Nations Security Council)-এর রেজোলিউশন ২৮০৩-এর আওতায়। ওই প্রস্তাবে গাজার প্রশাসন, পুনর্গঠন এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একটি অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়টি স্বাগত জানানো হয়।
এই বোর্ডের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (International Stabilisation Force) গঠনের পরিকল্পনাও যুক্ত রয়েছে। বহুজাতিক শান্তিরক্ষী কাঠামো হিসেবে এই বাহিনী যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা, নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে ভূমিকা নেবে বলে জানানো হয়েছে।
কারা রয়েছেন ট্রাম্পের বোর্ডে?
এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছে আমেরিকা। প্রতিষ্ঠাতা এক্সিকিউটিভ বোর্ডে আছেন একাধিক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব - মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও (Marco Rubio), ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ (Steve Witkoff), প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার (Tony Blair), বিশ্বব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা (Ajay Banga)। তাছাড়াও রয়েছেন জ্যারেড কুশনার (Jared Kushner) এবং মার্ক রোয়ান (Marc Rowan)।
মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক সহায়তার জন্য আলাদা ‘গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড’ও রাখা হয়েছে।
কোন কোন দেশ রাজি?
ইতিমধ্যেই একাধিক দেশ এই বোর্ডে যোগদানের ইঙ্গিত দিয়েছে। সৌদি আরব, মিশর, কাতার, তুরস্ক, জর্ডন, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ একাধিক আরব ও মুসলিম রাষ্ট্র ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। তারা এই উদ্যোগকে গাজায় যুদ্ধবিরতি সংহত করা ও পুনর্গঠন ত্বরান্বিত করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে।
মরক্কো, বাহরাইন এবং ইজরায়েলও যোগদানে সম্মতি জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৬০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তার মধ্যে ২৭টির বেশি দেশ ইতিমধ্যেই অংশগ্রহণে রাজি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তালিকায় রয়েছে আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান, কসোভো, প্যারাগুয়ে, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম-সহ একাধিক দেশ।
পশ্চিমের সংশয়
তবে সব দেশ সমান উৎসাহী নয়। ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন এবং স্পেনের মতো বড় পশ্চিমি শক্তিগুলি এই উদ্যোগে অংশগ্রহণ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে, অথবা সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছে। অনেকেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, যা এই মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রস্তাব নিয়ে এক ধরনের সংশয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারতের সামনে কূটনৈতিক সমীকরণ
গাজা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বরাবরই ভারসাম্যপূর্ণ - একদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, অন্যদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ঐতিহাসিক সমর্থন। ফলে ট্রাম্পের বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল প্রতীকী নয়, বরং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়া নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
১৯ ফেব্রুয়ারির প্রথম বৈঠকের আগে নয়াদিল্লি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন কূটনৈতিক মহলের নজরে।