রাহুল গান্ধীর দাবি মেনে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আগেই কাস্ট সার্ভে বা জাতি সুপারির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এবার বিজেপি শাসিত মধ্য প্রদেশ সরকার সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় প্রশ্চাপদ সম্প্রদায়ের জন্য ৮৭ শতাংশ সংরক্ষণ চালুর সিদ্ধান্ত নিল।

রাহুল গান্ধী ও মোহন যাদব।
শেষ আপডেট: 9 October 2025 16:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাহুল গান্ধীর দাবি মেনে নরেন্দ্র মোদীর সরকার আগেই কাস্ট সার্ভে বা জাতি সুপারির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এবার বিজেপি শাসিত মধ্য প্রদেশ সরকার সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় প্রশ্চাপদ সম্প্রদায়ের জন্য ৮৭ শতাংশ সংরক্ষণ চালুর সিদ্ধান্ত নিল।
মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে গিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর একটি স্লোগানকে স্মরণ করেছেন। রাহুলের মতে প্রতিটি জাতির জনসংখ্যার অনুপাতে সংরক্ষণ চালু হওয়া উচিত। তার এই নীতি তুলে ধরতেই রাহুল 'জিতনি আবাদি উতনা হক' স্লোগান দিয়েছেন। মোহন যাদবও বলেছেন তার সরকারের সংরক্ষণ নীতির গোড়ার কথা, 'জিতনি আবাদি উতনা হক।' তিনি জানান, তফশিলি জাতিদের জন্য সংরক্ষণের পরিমাণ হবে ১৫.৬ শতাংশ। ২১.১ শতাংশ সংরক্ষণের সুবিধা পাবেন তফশিলির উপজাতি বা আদিবাসীরা। অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণি বা ওবিসি'দের জন্য সংরক্ষণের পরিমাণ বৃদ্ধি করে করা হবে ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ সবমিলিয়ে সংরক্ষণের পরিমাণ হবে সাতাশি শতাংশ। যদিও ভারতে সংরক্ষণের পরিমাণ কখনোই ৫০ শতাংশের বেশি করা যাবে না বলে সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে। ৫০ শতাংশের বেশি সংরক্ষণ বরাদ্দ করতে হলে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। সীমাবদ্ধতা জানা সত্ত্বেও এর আগে বিহার এবং ঝাড়খন্ড সরকার ৫০ শতাংশের অতিরিক্ত সংরক্ষণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। ওই দুই রাজ্য যথাক্রমে ৬৫ ও ৭৫ শতাংশ সংরক্ষণ চালু করার কথা ঘোষণা করেছে।
রাজনীতির আশ্চর্য সমাপতন হল বিএসপি যখন তাদের একদা মরুদ্যান উত্তরপ্রদেশে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে তখন দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত কাঁসিরামের কথাই শোনা যাচ্ছে অন্য দলগুলির কথায়।
ইতিপূর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে লেখা চিঠিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে দাবি করেন, ২০১১-১২ সালে দেশব্যাপী হওয়া আর্থ-সামাজিক সমীক্ষা রিপোর্টটি প্রকাশ করা হোক। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের শেষ দিকে তৈরি ওই রিপোর্টটি প্রকাশের পাশাপাশি দাবি তুলেছেন, চাকরি, শিক্ষায় সংরক্ষণের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়া হোক।
এখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সংরক্ষিত পদ, আসনের পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। তারপরেও রাহুল গান্ধী স্লোগান দিয়েছেন, ‘জিতনি আবাদি, উতনা হক’—অর্থাৎ জনসংখ্যার অনুপাতে চাকরি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান-সহ সরকারি সুবিধা, সম্পদে সংরক্ষণ চালু করতে হবে।
ওই স্লোগানকে সামনে রেখেই বিহারে জাতি গণনা করিয়েছে নীতীশ কুমারের সরকার। তারপরই চেন্নাইয়ে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনের ডাকা সামাজিক ন্যায় সম্মেলনের মঞ্চ থেকে ১৪টি দল মিলে দেশব্যাপী জাতি গণনার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। সেখানে বিজু জনতা দল এবং অন্ধ্রপ্রদেশের ওয়াইএসআর কংগ্রেস ছাড়া বিজেপি বিরোধী প্রথমসারির সব দল হাজির ছিল। প্রস্তাবে সায় দেয় তৃণমূল, সিপিএম, সিপিআই, আপ, বিআরএস, জেডিএস।
নীতীশ, তেজস্বীরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করে আগেই দেশব্যাপী জাতি গণনার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু মোদী সরকার তা কানে তোলেনি। নীতীশদের দাবিকে সমর্থন করে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব ঘোষণা করে দিয়েছেন, তাঁরা ক্ষমতায় ফিরতে পারলে উত্তরপ্রদেশে জাতি গণনা করাবেন। এখন দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেস, বিজেপিসহ প্রায় সব দলই এখন জাতি গণনা এবং জনসংখ্যার অনুপাতে সংরক্ষণের সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবে গলা মিলিয়েছে।
ঘটনা হল, আজ থেকে বছর তল্লিশ আগে এই দাবি তুলেই উত্তর ও মধ্য ভারতের রাজনীতিতে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন কাঁসিরাম। ঘটনাচক্রে আজ বৃহস্পতিবার ৯ অক্টোবর কাঁসি রামের জন্মদিন।
১৯৮৪-তে তাঁর হাতে তৈরি বহুজন সমাজবাদী পার্টির মূল স্লোগান ছিল ‘জিসকি জিতনি সংখ্যা ভারী, উসকি উতনি হিস্যেদারি’—অর্থাৎ যারা সংখ্যায় যত, সরকারি সম্পদ, সুযোগ-সুবিধায় তার ততটা প্রাপ্য। রাহুল গান্ধী সেই কথাটিই আরও সহজ করে বলছেন, ‘জিতনি আবাদি, উতনা হক।’
কংগ্রেসের এক বর্ষীয়ান নেতার কথায় অতীতে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকরে কংগ্রেসের দুই প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা ও রাজীব গান্ধী পদক্ষেপ না করলেও দলের আর এক প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে ওবিসি সংরক্ষণ চালু করেছিলেন। তার আগে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়নের সুযোগ পাননি ঘোষণার দিন দুয়েকের মাথায় তাঁর সরকারের পতন হওয়ায়।
ওই নেতা আরও বলেন, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সময়ে হওয়া আর্থ-সামাজিক সমীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি, কর্মসংস্থানের হাল কেমন তা জানা। গত এগারো বছরে মোদী সরকার ওই রিপোর্ট সম্পর্কে উচ্চবাচ্য করা দূরে থাক, সংসদে দাবি করেছে, রিপোর্ট অসম্পূর্ণ। যদিও সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে পাওয়া খবর হল, নীচু জাতি বলে চিহ্নিত অংশের মানুষের পশ্চাৎপদতা ভয়াবহ। কিন্তু বাড়তি সংরক্ষণের দাবি উঠবে বুঝেই রিপোর্টটি প্রকাশ করছে না বিজেপি সরকার। উল্টে গেরুয়া শিবির বৃহত্তর হিন্দু ঐক্য প্রতিষ্ঠার কথা বলে সব জাতিগোষ্ঠীকে এক ছাতার তলায় আনার চেষ্টা করছে। বিজেপির এই ছক উল্টে দিতে কাঁসি রামের পথেই হাঁটতে চাইছে সব দল।