সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েই রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান জানালেন, "এরকম মিথ্যাবাদী কমিশন আমি কখনও দেখিনি। বহুদিন রাজনীতি করেছি, এরকম ঔদ্ধত্য আগে দেখিনি আমি।"

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও জ্ঞানেশ কুমার
শেষ আপডেট: 2 February 2026 19:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এসআইআর (SIR West Bengal) ঘিরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ জানাতে দিল্লি গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যপাধ্যায় (Mamata Banerjee), অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। কিন্তু মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে প্রস্তাবিত সেই বৈঠক হয়েও হল না। এক ঘণ্টারও বেশি সময় পর নির্বাচন সদন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। জানালেন, "এরকম মিথ্যাবাদী কমিশন আমি কখনও দেখিনি। বহুদিন রাজনীতি করেছি, এরকম ঔদ্ধত্য আগে দেখিনি আমি।" তাঁর অভিযোগ, বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছে কমিশন।
জীবিত হয়েও নির্বাচন কমিশনের নথিতে ‘মৃত’ বলে চিহ্নিত ৫০ জন ভোটারকে রাজধানীতে নিয়ে গিয়েছে শাসকদল। পাশাপাশি, এসআইআর প্রক্রিয়ার কারণে পরিবারের কোনও না কোনও সদস্যের মৃত্যু হয়েছে— এমন অভিযোগ থাকা আরও ৫০ জনকেও দিল্লিতে আনা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে।
এই ইস্যুতেই সোমবার নির্বাচন কমিশনের দফতরে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ছিলেন তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এসআইআর-এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত বলে দাবি করা কয়েক জন ভোটার ও পরিবারের সদস্যদের কমিশনের সামনে হাজির করানো হয়।
সোমবার নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে তৃণমূলের প্রতিনিধি দলের বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-সহ আরও দুই নির্বাচন কমিশনার। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে রাজ্যে অনিয়ম, হয়রানি এবং মানবিক বিপর্যয়ের অভিযোগ তুলে ধরে কমিশনের কাছ থেকে সরাসরি ব্যাখ্যা ও পদক্ষেপ দাবি করে তৃণমূল। কিন্তু তার কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
এক ঘণ্টার কিছু সময় পর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে প্রস্তাবিত বৈঠকে তাঁরা যোগ দেননি। তাঁর অভিযোগ, বৈঠকের আগেই তাঁদের অসম্মান ও অপমান করা হয়েছে।
নির্বাচন সদন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের অসম্মান, অপমান করা হয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, কমিশনের বৈঠকে এমন একজনকে উপস্থিত করা হয়েছিল যিনি নির্বাচন কমিশনের কোনও আধিকারিক নন। মমতার প্রশ্ন, “সীমা খন্না কে? উনি নির্বাচন কমিশনের কেউ নন। বিজেপির আইটি সেলের লোক।”
মুখ্যমন্ত্রীর আরও অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ এত বড় সংখ্যায় ভোটার বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তরফে কোনও প্রশ্নই তোলা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। কমিশনের এই নীরবতা নিয়েই তাঁর যত আপত্তি।
বৈঠকে ‘এসআইআর-এ ভুক্তভোগী’ ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠকের শুরুতেই তাঁদের পরিচয় করিয়ে দেন তিনি। সেই প্রসঙ্গেই ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।
মমতার দাবি, “যাঁরা হিন্দু-মুসলমান করেন, তাঁরা বুঝতে পারছেন? এখানে দু’জন মুসলিম রয়েছেন। ক’জন হিন্দু?” ওয়াকিবহাল মহলের অনেকেই মনে করছেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার নামে কোনও বিশেষ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বাছাই করার যে অভিযোগ উঠছে— তা-ই সামনে আনতে চেয়েছেন তিনি।
কমিশনকে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে মমতা বলেন, নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে কেন এসআইআর করা হল! একই সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, ‘বিজেপি শাসিত অসমে কেন এই প্রক্রিয়া করা হল না?’
মমতার অভিযোগ, এসআইআর-এর নামে রাজ্যে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এই কাজ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে করা হয়েছে এবং তার নেপথ্যে রয়েছেন সীমা খন্না। কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এত বড় সংখ্যায় ভোটার বাদ পড়ার পরেও নির্বাচন কমিশন কোনও ব্যাখ্যা চাইছে না।
এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে করে কটাক্ষের সুরে মমতা বলেন, ‘‘আপনারা প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করুন। ওঁর বাবা-মায়ের জন্মের কুন্ডলী বার করতে বলুন।’’ অতীতের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, লালকৃষ্ণ আডবাণীর নাগরিকত্ব ও জন্মস্থান সংক্রান্ত প্রশ্নও এক সময় উঠেছিল। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করেই মমতার দাবি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এদিনের বৈঠকের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, বৈঠকের সময় কমিশনের নিজস্ব ক্যামেরাম্যানরা উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু বাইরের ক্যামেরাম্যানদের সেখানে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে মমতা বলেন "আপনাদের যা ইচ্ছা তাই করবেন তা তো হয় না। বহুদিন রাজনীতি করেছি, মন্ত্রীও ছিলাম। এরকম অহঙ্কারী নির্বাচন কমিশন কখনও দেখিনি।”