হায়দরাবাদে আইভিএফ সেন্টারের আড়ালে শিশু পাচারের চক্র ফাঁস। ৩০-৪০ লক্ষ টাকায় শিশু কেনা-বেচা, ধৃত ২৫ জনের মধ্যে চিকিৎসক, এজেন্ট ও বাবা-মা। পুলিশ জানাল পুরো চক্রের কৌশল।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 13 August 2025 16:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সন্তানহীন দম্পতিদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে একটি বিশাল শিশু পাচার চক্র চালানোর অভিযোগে তেলেঙ্গনা এবং অন্ধ্রপ্রদেশের একাধিক কেন্দ্রে হানা দিয়ে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। এই চক্রের মূল পান্ডা সেকেন্দ্রাবাদের 'ইউনিভার্সাল সৃষ্টি ফার্টিলিটি সেন্টার'-এর মালিক ডা. আথালুরি নাম্রাতা এবং তাঁর সহযোগীরা। অভিযুক্তদের মধ্যে ৪ জন চিকিৎসক, ল্যাব টেকনিশিয়ান, এজেন্ট এবং এমনকি পাচার হওয়া শিশুদের কিছু প্রকৃত বাবা-মা-ও রয়েছেন।
জানা গেছে, গত ১৫ বছর ধরে এই সেন্টারটি আইভিএফ এবং সারোগেসির পরিষেবা দেওয়ার নাম করে এই কাজ চালিয়ে আসছিল। তবে তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই সেন্টারে কোনও সারোগেসি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়নি। বরং, দম্পতিদের কাছ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিয়ে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এমন সব শিশু যাদের সঙ্গে তাদের কোনও জিনগত সম্পর্ক নেই।
নর্থ জোন ডিসিপি এস রশ্মি পেরুমাল এনডিটিভিকে বলেন, "তারা একদিকে যেমন সন্তানহীন দম্পতিদের কাজে লাগিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে শিশুদের আসল বাবা-মায়ের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে শিশুদের কিনে নিয়েছে।"
কীভাবে চলত এই চক্র?
পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট হিসেবে কাজ করত। প্রথমে, চক্রটি দম্পতিদের কাছ থেকে নকল সারোগেসির জন্য ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা নিত। এরপর তাদের বায়োলজিক্যাল স্যাম্পেল নিয়ে বলা হতো যে ভ্রূণ তৈরি করে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। নয় মাস পর এজেন্টদের মাধ্যমে দুর্বল আর্থিক অবস্থার মায়েদের কাছ থেকে কেনা শিশুদের সেই দম্পতিদের হাতে তুলে দেওয়া হত।
দম্পতিদের বিশ্বাস করানোর জন্য জাল মেডিকেল এবং ডিএনএ রিপোর্টও দেওয়া হতো, যাতে তারা ভাবে শিশুটি তাদেরই। শিশু বিক্রির জন্য এজেন্টদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হত। একটি মেয়ের জন্য ৩.৫ লক্ষ টাকা এবং একটি ছেলের জন্য ৪.৫ লক্ষ টাকা। আর প্রকৃত বাবা-মাকে দেওয়া হতো মাত্র ৯০ হাজার টাকা।
গত ২৭ জুলাই রাজস্থানের এক দম্পতির অভিযোগের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু হয়। তারা একটি স্বাধীন ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে জানতে পারেন যে সারোগেসির মাধ্যমে পাওয়া শিশুটির সঙ্গে তাদের কোনো জিনগত সম্পর্ক নেই।
এই ঘটনার তদন্ত চলাকালীন গোপালপুরম থানায় নতুন করে আরও আটটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একটি ঘটনায়, এক দম্পতিকে ২২ লক্ষ টাকা নিয়ে নকল সারোগেসির মাধ্যমে একটি মৃত শিশু দেখানো হয়। পরে জানা যায়, সেই শিশুটি তাদের ছিল না। আর একটি দম্পতি ১৯ লক্ষ টাকা দেওয়ার পর একটি প্রি-টার্ম মেয়ে পায়। ডিএনএ টেস্টে দেখা যায়, শিশুটির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। যখন তারা প্রতিবাদ করে, তখন অভিযুক্তরা তাদের হুমকি দেয়।
এই ঘটনায় দুটি শিশুকে সরকারি কেন্দ্র 'শিশু বিহার'-এ পাঠানো হয়েছে, কারণ তাদের প্রকৃত বাবা-মা তাদের ছেড়ে দিয়েছে এবং যে দম্পতিরা তাদের গ্রহণ করেছিল, তারাও প্রতারিত বোধ করে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, চক্রের প্রধান অভিযুক্ত ডা. আথালুরি নাম্রাতার বিরুদ্ধে আগেও প্রায় ১৫টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে কিছু মীমাংসা হয়েছে আর কিছু এখনো বিচারাধীন। এই মামলাগুলোর মধ্যে প্রতারণা, শিশু পাচার এবং মেডিকেল জালিয়াতির মতো অভিযোগ রয়েছে। এই অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে, হায়দরাবাদ পুলিশ কমিশনার মামলাটি সেন্ট্রাল ক্রাইম স্টেশনের বিশেষ তদন্তকারী দলকে হস্তান্তর করার নির্দেশ দিয়েছেন।