ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে নতুন বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে এই তথ্য উঠে এসেছে স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার (এসবিআই) এক প্রতিবেদনে।

মোদী ও পুতিন
শেষ আপডেট: 8 August 2025 16:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাশিয়ার (Russian Oil) কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করলে চলতি অর্থবছরে ভারতের তেল (Indian Oil) আমদানি ব্যয় প্রায় ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং পরের অর্থবছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে নতুন বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে এই তথ্য উঠে এসেছে স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার (এসবিআই) এক প্রতিবেদনে।
সেখানে বলা হয়েছে, রাশিয়ার তেল সরবরাহ বন্ধ হলে ভারত আবারও ইরাক (Iraq) থেকে তেল কেনার কথা বিবেচনা করতে পারে, যে দেশটি ইউক্রেন (Ukraine) যুদ্ধের আগে ভারতের শীর্ষ সরবরাহকারী ছিল। এরপর বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকেও আমদানি বাড়ানো যেতে পারে।
ভারত-আমেরিকা (India-America) বাণিজ্য উত্তেজনা বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পর, যেখানে রাশিয়ার তেল আমদানি অব্যাহত রাখায় ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক আরোপ করা হয় এবং পরে তা দ্বিগুণ করে ৫০% করা হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারত ও ব্রাজিল সমানভাবে সর্বোচ্চ ৫০% মার্কিন শুল্কের আওতায় পড়েছে।
এসবিআই-এর হিসাব অনুযায়ী, যদি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাকি সময়ে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করে, তবে জ্বালানি বিল প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ১১.৭ বিলিয়ন ডলার বাড়বে।
রাশিয়া বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রায় ১০% দেয়। যদি সব দেশ রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০% পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২২ সালের পর থেকে ভারত রাশিয়ান তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলির নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া তেল ৬০ ডলার প্রতি ব্যারেলের সীমার মধ্যে ছাড়ে বিক্রি করে, যা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল মাত্র ১.৭%, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫.১%— বর্তমানে যা ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত মোট ২৪৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যার মধ্যে ৮৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন এসেছে রাশিয়া থেকে।
ভারতীয় রিফাইনারি সংস্থাগুলো সাধারণত আরব দুনিয়ার দেশগুলো থেকে বার্ষিক চুক্তির মাধ্যমে তেল কেনে, যা মাসভিত্তিক অতিরিক্ত সরবরাহের নমনীয়তা দেয়। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর আমেরিকা পশ্চিম আফ্রিকা ও আজারবাইজান থেকেও আমদানি শুরু করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ান সরবরাহ বন্ধ হলে ভারত বিদ্যমান চুক্তির আওতায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আমদানি বাড়াতে পারবে।
তবে রাশিয়ার সরবরাহ কমে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়বে, যা সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি করবে।
এদিকে, বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন— ভারত সরকার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাশিয়ান তেল আমদানি করছে, এবং এজন্য তিনি ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন। পরে এক মার্কিন সংবাদমাধ্যমে তিনি জানান, "ভারত ভাল বাণিজ্য অংশীদার নয়... আমরা ২৫% শুল্কে রাজি হয়েছিলাম, কিন্তু তারা রাশিয়ান তেল কিনছে বলে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াব।"
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন শাস্তিমূলক পদক্ষেপের হুমকির কারণে রাশিয়া বর্তমানে ভারতীয় ক্রেতাদের তুলনামূলক কম দামে তেল দিচ্ছে। কেপলার লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার ইউরালস তেল বর্তমানে ব্রেন্ট তেলের চেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলারেরও বেশি সস্তা, যদিও দুই সপ্তাহ আগে এই পার্থক্য প্রায় ছিল না। তবে রাশিয়ার ৩৭% বাজার শেয়ার প্রতিস্থাপন ব্যয়বহুল হবে এবং ভারত সম্পূর্ণ আমদানি বন্ধ করবে— এ সম্ভাবনা কম।
কৃষি ও ওষুধ খাতে প্রভাব
ট্রাম্পের শুল্কনীতির ফলে কৃষি খাতও প্রভাবিত হতে পারে। এসবিআই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের উচিত কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং টেকসই বাজার অবকাঠামো ছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শোষণমূলক কার্যকলাপ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
ফার্মাসিউটিক্যাল অর্থাৎ ঔষধি খাতের ক্ষেত্রেও সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন ভারতীয় ওষুধ রফতানির ওপর শুল্ক আরোপ করেনি, তবে ৫০% শুল্ক দিলে চলতি অর্থবছরে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর আয় ৫% থেকে ১০% কমে যেতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের প্রতিযোগিতা কমবে এবং ব্যয় বাড়লেও তা ভোক্তাদের ওপর চাপানো সম্ভব হবে না।
এসবিআই-এর মতে, ভারত সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চমানের জীবনদায়ী ওষুধের একটি প্রধান সরবরাহকারী। যুক্তরাষ্ট্রে জেনেরিক ওষুধ প্রেসক্রিপশনের ৯০% হলেও, ব্যয়ের হিসাবে তা মাত্র ২৬%। ফলে ভারতের ওপর শুল্ক আরোপ আমেরিকান নাগরিকদেরও বড় ধরনের ব্যয়বৃদ্ধির মুখে ফেলবে।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, কৃষক, জেলে ও দুগ্ধশিল্পের স্বার্থ রক্ষায় তিনি কখনও আপস করবেন না এবং প্রয়োজনে ব্যক্তিগত ক্ষতির ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত।