গত ৪ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, বিগত চার মাস ধরে বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে একপ্রকার ঝড় বয়ে গিয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের দফতর এবং রাজ্য প্রশাসনের।

ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 1 October 2025 12:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। আসন্ন বিধানসভার নির্বাচন হবে এই ভোটার তালিকার ভিত্তিতে। নাগরিকত্ব নিয়ে বিবাদ-বিতর্ক পাশ কাটিয়ে বিহার শেষ পর্যন্ত কীভাবে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ শেষ করতে পারল, সরকারি মহলে তা নিয়ে তুমুল কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিস্তারিত জানার পর অনেকেই একে ‘ভোটার তালিকা সংশোধনের বিহার মডেল’ বলে অভিহিত করছেন। সেই সঙ্গে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মত, সমাধান সূত্র থেকেই স্পষ্ট হয়েছে যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা ‘সার’ চালু করার আগে কমিশন গভীরে ভাবনাচিন্তা করেনি। তারা এই ব্যাপারে এককভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নিলে বিতর্ক এতদূর গড়াত না।
খসড়া তালিকা থেকে শেষ পর্যন্ত ৪৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। নতুন নাম যুক্ত হয়েছে ২১ লাখ ৫৩ হাজার। খসড়া তালিকায় ৬৫ লাখ নাম বাদ দিয়ে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল সাত কোটি ২৪ লাখ। চূড়ান্ত তালিকায় স্থান হয়েছে সাত কোটি ৪২ লাখের। যারা আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের সুযোগ পাবেন।
গত ৪ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, বিগত চার মাস ধরে বিহারের ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে একপ্রকার ঝড় বয়ে গিয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের দফতর এবং রাজ্য প্রশাসনের। নাগরিকত্ব প্রমাণে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত ১১টি নথিতে আধার কার্ড এবং রেশন কার্ড না থাকায় বহু মানুষ সমস্যায় পড়েছিলেন। বিরোধীরা অভিযোগ তোলে কমিশন পরিকল্পনা করে নাম বাদ দিতে চাইছে। এটা বিজেপির চক্রান্ত। অন্যদিকে, বিজেপি অভিযোগ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো বিহারের তালিকাতেও বহু বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষের নাম আছে। এছাড়া মৃত ও ভুয়ো ভোটার তো আছেই। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি উল্টো বুঝতে পেরে বিজেপিও কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর শর্ত শিথিল করার দাবি তোলে বিহারে।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবির একদিকে আদালতের দ্বারস্থ হয়, অন্যদিকে, রাহুল গান্ধী, তেজস্বী যাদবেরা ভোট চুরির অভিযোগ তুলে অধিকার যাত্রা করেন। রাহুল এমনকী কমিশনকেও ভোট চুরিতে অভিযুক্ত করে বসেন। ফলে রাজনীতি তুঙ্গে ওঠে। সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তী রায়ে আধারকে দ্বাদশ নথি হিসাবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেয় কমিশনকে।
কিন্তু তাতেই কি নাগরিকত্ব যাচাইয়ে নথির সমস্যা মিটে গিয়েছিল? বিহারের মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের দফতর এবং রাজ্য প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ে কমিশন ১২টি নথির বাইরেও নিজেরা কয়েকটি সরকারি তালিকার সাহায্য নিয়েছে। নথি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা গড়ানোর পরই কমিশন তালিকা সংশোধনের কাজে যুক্ত কর্মী ও আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ শিবিরে জানিয়ে দেয় যে ভোটাররা নাগরিকত্বের উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ জমা দিতে পারবেন না তাদের হয়ে প্রশাসনকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। চেষ্টা করতে হবে কীভাবে নাগরিকত্ব প্রমাণের সমস্যা দূর করা যায়।
৪ জুন কমিশনের নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল ২০০৩ সালের তালিকায় যাদের নাম ছিল তাদের নতুন করে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে না। বাকিদের দিতে হবে। তা নিয়েই বিবাদ চরমে ওঠে। জানা গিয়েছে, এই বিবাদের মধ্যেই পরবর্তী সময়ে কমিশন বুথ লেবেল অফিসারদের নির্দেশ দেয় ২০০৩ সালের ভোটারদের চিহ্নিত করে তাদের সঙ্গে পরে নাম তোলা বা নতুন আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিত করতে। তাতেই দেখা যায় প্রায় ৭১ শতাংশ ভোটারের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের সমস্যা নেই। এদের মধ্যে ৫২ শতাংশের নাম ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় ছিল। বাকি ভোটাররা ২০০৩ সালের তালিকায় নাম থাকা ভোটারদের পরিবারের সদস্য অথবা নিকট কিংবা দূর সম্পর্কের আত্মীয়।
বাকি ২৯ শতাংশের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব যাচাইয়ে কমিশন কী পদক্ষেপ করে? জানা গিয়েছে, ১২টি নির্ধারিত নথির বাইরেও বিহারে কমিশন তিনটি তালিকার সাহায্য নিয়েছে। একটি হল ফ্যামিলি রেজিস্ট্রার বা বংশ তালিকা। বিহারের ব্লক অফিসে এই তালিকা আছে। দ্বিতীয় তালিকা হিসাবে কাজে লাগানো হয় এসসি-এসটি রেজিস্ট্রার। অনেক পরিবার তাদের তফসিলি পরিচয় পত্র হারিয়ে ফেলায় নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। তাদের ক্ষেত্রে এসসি-এসটি রেজিস্ট্রার খতিয়ে দেখা হয়েছে। সেখানে নাম থাকলেই বৈধ ভোটার হিসাবে আবেদন গ্রহণ করা হয়।
তৃতীয় তালিকাটি হল কাস্ট সেন্সারের রিপোর্ট। বিহারে দু বছর আগে রাজ্য সরকার জাতিগত সুমারি করিয়েছে। ওই তালিকায় পরিবার ধরে নাম-ঠিকানার উল্লেখ আছে। যে ভোটার ও আবেদনকারীরা নাগরিকত্বের উপযুক্ত প্রমাণ দাখিল করতে পারেননি তাদের ক্ষেত্রে কাস্ট সেন্সাস রিপোর্ট কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। অর্থাৎ ১২টি নথির বাইরে আরও তিনটি তালিকাকে নাগরিকত্ব যাচাইয়ে ব্যবহার করে কমিশন। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের পর কমিশন তাদের আগের নির্দেশিকায় এই সব পরিবর্তন করেছিল। শীর্ষ আদালত বলেছিল, গণহারে বাদ দেওয়া নয়, কমিশনের উচিত সর্বজনীন ভোটার তালিকা তৈরি করা যাতে গণহারে নাম যুক্ত হতে পারে। বিহারে শেষ পর্যন্ত কমিশন নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্নে অনড় অবস্থান থেকে অনেকটাই পিছিয়ে যায়।
প্রশ্ন হল, বিহারের মতো একই ব্যবস্থা কি অন্য রাজ্যগুলিতেও করা সম্ভব। যেমন পশ্চিমবঙ্গেই তা করা কঠিন বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। এ রাজ্যে বিহারের মতো ব্লক ভিত্তিক ফ্যামিলি রেজিস্ট্রারের অস্তিত্ব নেই। বাংলায় কাস্ট সেন্সাসও করা হয়নি। তবে ২০১২ সালে গোটা দেশের সঙ্গে বাংলাতেও আর্থ সামাজিক সুমারি করা হয়েছিল। কমিশন সেই তালিকা কাজে লাগানোর নির্দেশ দিতে পারে। তবে সেই কাজ হয়েছিল শুধু গ্রামাঞ্চলে। কারও কারও মতে বিপিএল বা দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারীর তালিকাকেও কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। ওই তালিকায় পরিবার ভিত্তিক তথ্য আছে। যদিও এগুলি কোনওটাই নাগরিকত্ব যাচাই করে করা হয়নি। তবে সুপ্রিম কোর্ট আধারকে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে গ্রাহ্য করার নির্দেশ দেওয়ায় সরকারি যে কোনও তালিকাকেই এই ক্ষেত্রে গ্রাহ্য করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।