এক সময় বৌদ্ধ শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। অথচ সেই উপত্যকাতেই পরে ইসলামী শাসনের সূচনা হয় এক বৌদ্ধ রাজপুত্রের (Buddhist prince) হাত ধরে।
.jpeg.webp)
প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 29 December 2025 12:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাশ্মীর উপত্যকার (Kashmir) ইতিহাস শুধু রাজা-রাজড়া বা যুদ্ধজয়ের গল্প নয়। ধর্ম, রাজনীতি আর ভাগ্যের অদ্ভুত মোড়ে গড়ে ওঠা এক দীর্ঘ রূপান্তরের উপাখ্যানও। সাম্প্রতিক সময়ে বারামুল্লার জেহানপুরায় খননে কুষাণ যুগের স্তূপ আবিষ্কার আবার মনে করিয়ে দিয়েছে, কাশ্মীর (Kashmir Islam) এক সময় বৌদ্ধ শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। অথচ সেই উপত্যকাতেই পরে ইসলামী শাসনের সূচনা হয় এক বৌদ্ধ রাজপুত্রের (Buddhist prince) হাত ধরে। ইতিহাসের এই পর্বটি আজও বিস্ময় জাগায়।

পুরাণ ও রাজতরঙ্গিণী অনুযায়ী, কাশ্মীর উপত্যকা এক সময় ছিল বিশাল জলাশয়— সতীসর হ্রদ। সেখানে বাস করত জলোদ্ভব নামে এক অসুর। ঋষি কাশ্যপের তপস্যায় দেবতারা হস্তক্ষেপ করেন। বরামুল্লার পাহাড়ে আঘাত হেনে জল বের করে দেওয়া হয়, অসুরের মৃত্যু ঘটে, আর জন্ম নেয় উর্বর কাশ্মীর।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে অশোক কাশ্মীরে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটান ও শ্রীনগর প্রতিষ্ঠা করেন। পরে কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের আমলে চতুর্থ বৌদ্ধ সংঘ অনুষ্ঠিত হয় এখানেই। অষ্টম শতকে ললিতাদিত্যর শাসনে কাশ্মীর পৌঁছয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শিখরে— মার্তণ্ড সূর্যমন্দির তার সাক্ষী।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজশক্তি দুর্বল হয়। জমিদার শ্রেণি ‘দামর’রা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। লুট, ষড়যন্ত্র, গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে উপত্যকা। সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, শুরু হয় দুর্ভিক্ষ।
তিন আগন্তুক
চতুর্দশ শতকের শুরুতে কাশ্মীরে আশ্রয় নেন তিন শরণার্থী— সোয়াত থেকে আসা শাহ মীর, উত্তর দার্দ অঞ্চল থেকে লঙ্কর চক এবং লাদাখের বৌদ্ধ রাজপুত্র রিঞ্চন। কেউই তখন জানতেন না, এঁদের হাত ধরেই ইতিহাসের মোড় ঘুরবে।
১৩২০ সালে মঙ্গোল সেনাপতি দুলুচার আক্রমণে কাশ্মীর কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। রাজা সুহদেব পালিয়ে যান। আট মাসের তাণ্ডবে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়।
এই অরাজকতার মধ্যেই ক্ষমতা দখল করেন রিঞ্চন। প্রধানমন্ত্রী রামচন্দ্রকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন তিনি। বৈধতা পেতে বিয়ে করেন রামচন্দ্রের কন্যা, বুদ্ধিমতী ও প্রভাবশালী কোটা রানিকে।
প্রত্যাখ্যান থেকে রূপান্তর
কাশ্মীরি সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে রিঞ্চন শৈব ধর্ম গ্রহণের আবেদন জানান প্রধান পুরোহিত দেবস্বামীর কাছে। কিন্তু জাতিগত কারণে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। সেই প্রত্যাখ্যানই ইতিহাস বদলে দেয়। সুফি সাধক বুলবুল শাহের সংস্পর্শে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন রিঞ্চন। নাম নেন সুলতান সদরুদ্দিন— কাশ্মীরের প্রথম মুসলিম শাসক।
মাত্র তিন বছরের শাসনকাল। অভিজাতদের ষড়যন্ত্রে আহত হয়ে মৃত্যু হয় রিঞ্চনের। মৃত্যুর আগে স্ত্রী কোটা রানি ও সন্তানকে দায়িত্ব দিয়ে যান শাহ মীরের হাতে।
পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় কোটা রানি নানা রাজনৈতিক সমঝোতায় কাশ্মীর শাসন করেন। তিনিই শেষ হিন্দু শাসক। তাঁর মৃত্যুর পর শাহ মীরের হাত ধরেই স্থায়ী ভাবে ইসলামী শাসনের সূচনা হয় উপত্যকায়।