
শেষ আপডেট: 9 November 2023 18:10
বেনারসের বিবরণ দিতে গিয়ে ফেলুদা লালমোহনবাবুকে বলেছিল বেনারসের বিখ্যাত গন্ধের কথা! কথা হচ্ছিল দশাশ্বমেধ ঘাটে বিজয়ার ভাসান নিয়ে। কিন্তু রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিকের বিবরণকে পাশ কাটিয়ে ফেলুদা বাঙালি পাঠককে চিনিয়ে দেয় কাশীর নানা গন্ধ। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ উপন্যাস যারাই পড়েছেন, এইটুকু দিয়ে কাশী চেনা বোধ হয় তাঁদের সবারই শুরু হয়। এই ২০২৩ সালে এসেও গোটা বেনারস শহর জুড়ে নাককেই পরীক্ষা দিতে হয় বটে! তবে সেটা গন্ধের জন্য নয়, ধুলোর জন্য!
কাশীর বয়স কত? খাঁটি খবর নেই। কেউ অনুমান করেন আড়াই হাজার বছর, কেউ বলেন তিন হাজার বছর, কেউ আরও বেশি বাড়িয়ে দেন। কাশী সেই সুযোগ দেয় ইতিহাসকে। গঙ্গাতীরের এই ভূমি পৃথিবীর প্রাচীনতম বাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভারতে মাদুরাই ছাড়া এই গরিমা বোধ হয় আর কারও নেই। বেনারস, বারাণসী, কাশী—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, নামে কি কিছু আসে যায়?
ইতিহাসবিদরা বলেন, অবশ্যই আসে যায়। কাশী বেঁচে থাকে তার নামেই। তিনটি নামেরই তিন রকমের প্রাণশক্তি রয়েছে। পুরাণে আছে, এককালে, সেই ষোড়শ মহাজনপদের কালে, কাশীরাজ্য ছিল এক প্রবল পরাক্রমশালী মহাজনপদ। উত্তরে বরুণ নদী, দক্ষিণে অসি নদী। আজ আড়াই হাজার বছর পরে বরুণ এখনও আছে, অসি ক্ষীণকায়। দেখে চেনা যাবে না যে, এই নদী থেকেই আসলে শহরের নাম হয়েছে বারাণসী। নামটা যদিও আছে। কাশীর অন্যতম বিখ্যাত ঘাটের নামে, অসসি ঘাট! আগে এখানেই অসি নদী এসে মিশত পুণ্যতোয়া গঙ্গায়।
অথচ এই আড়াই হাজার বছরে কাশীর ঘাট দিয়ে গঙ্গার বহু স্রোত বয়ে গিয়েছে, ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে রাজনীতি, পালটে দিয়েছে ইতিহাস, জনজীবন, সমাজ, অর্থনীতি। এককালে স্বাধীন রাজ্য কাশী পরে হয়ে ওঠে শিল্প-সাহিত্যের অন্যতম কেন্দ্র, তিন ধর্মের মিলনক্ষেত্র। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল, অন্যতম শক্তিশালী দেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী কেন্দ্র হয়ে ওঠা বোধ হয় কাশীর ইতিহাসেও প্রথমবার!
বারাণসী জংশন অবধি ট্রেনে যদি আসতে পারেন, সরাসরি ঢুকে পড়বেন ধুলোর শহরে। যদি বিমানবন্দর বা ওদিকে মুঘলসরাই থেকে আসেন, বুঝবেন, উন্নয়ন কাকে বলে। দীনদয়াল উপাধ্যায় জংশন স্টেশন থেকে বেরিয়ে গাড়ি হাইওয়েতে উঠলেই দেখা যাবে, একদিকে ট্রাকের সারি, অন্যদিকে গোটা রাস্তার দু’পাশে চলছে নির্মাণকাজ। সকালে শীতের আমেজ। তবু ড্রাইভার কাঁচ তুলে এসি চালিয়ে দেবে। ‘ইয়ে তো হর রোজই হ্যায় ভাইয়া’—অল্পবয়সী ড্রাইভার হাসেন।
গোটা কাশী শহরটাকে চট করে আলাদা করা যাবে না আর। চারদিকে চলছে নির্মাণকাজ। জেগে উঠেছে ঝাঁ চকচকে বহুতল। বিপণি কেন্দ্র থেকে অত্যাধুনিক রেস্তোরাঁ সব আছে। রাস্তায় গাড়ির ভিড়। টোটো-অটোকে যেন প্রবল প্রতাপে শাসন করছে বিলাসবহুল গাড়ি। আগে কাশী গেলে বলা হত, ‘রবিদাস গেটের কাছে পেহেলওয়ান লস্যি’ বা ‘গোধুলিয়ায় কাশী চাট ভাণ্ডারের চাট কিন্তু অবশ্যই চেখে দেখতে হবে’। আর মধ্যাহ্নভোজ-নৈশভোজের জন্য কাশীর নানা পুরনো বাঙালি হোটেল।
কিন্তু বেনারসে পা রাখার প্রথমদিনেই থমকাতে হল। কাশী চাট ভাণ্ডারের ভিড় একই আছে। লাইন পড়ে গিয়েছে প্রায়। কিন্তু গোধুলিয়ার চৌমাথার পাশেই একটা ছোট্ট আটপৌরে বাঙালি হোটেল ছিল। গিয়ে দেখা গেল, হোটেলের ঝাঁপ পড়ে গিয়েছে।
তাতে অবশ্য অসুবিধের কিছু নেই। সার দিয়ে খাবারের দোকান রয়েছে। অত্যাধুনিক ঝাঁ চকচকে রেস্তোরাঁ আছে। অসসি ঘাটের কাছে এলে মনে হবে, বোধ হয় কলকাতার সাদার্ন অ্যাভিনিউ বা যোধপুর পার্কে চলে এসেছেন। দিব্যি বেশ কিছু সাজানো ছিমছাম ক্যাফে। তাতে কন্টিনেন্টাল, চিনে, জাপানি সব পাবেন। মনেই হবে না যে, এসেছেন প্রাচীনতম শহরে।
গত কয়েক বছরে এই প্রাচীনত্বকে টপকে আধুনিকের এসে যাওয়াটাই যেন কাশীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কার্যত ঢেলে সাজানো হচ্ছে গোটা শহরকে। সেজে উঠেছেন কাশীর অভিভাবক, স্বয়ং বাবা বিশ্বনাথ। গোটা বিশ্বনাথ মন্দিরকে ঝাঁ চকচকে আধুনিক করে ফেলা হয়েছে, পুণ্যার্থীদের জন্য করা হয়েছে সব রকমের সুবন্দোবস্ত। কোভিড পরবর্তী এই পৃথিবীতে বিশ্বনাথও আর ভক্তের নাগালে নেই। আগে মন্দিরের গর্ভগৃহে বিশ্বনাথের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল ভক্তের। এখন বাইরে থেকেই দর্শন করতে হবে। দিতে পারবেন পুজো। পাশেই অন্নপূর্ণার মন্দিরে পাবেন অন্নভোগ। সব কিছু বদলেছে, শুধু ভক্তের আকুতি আর ঘন্টাধ্বনি একই আছে। যুগ যুগ ধরে। আবেগের সব অঙ্ক যেখানে মিলিয়ে দেন বিশ্বনাথ।
এতেও যদি আপনার মনঃক্ষুণ্ণ ভাব থাকে, আপনাকে চলে যেতে হবে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে। গোধুলিয়া থেকে টোটো নিয়ে নিন। টোটোওয়ালা অবশ্য আপনাকে একটু বুঝবার চেষ্টা করবে। যদি বুঝতে পারে, আপনি তল্লাটে নতুন, ট্যুরিস্ট, তাহলে দর বেড়ে যাবে ‘একশো বিশ টাকা’। যদি খুব স্মার্টলি বলতে পারেন, ‘লঙ্কা যাব’, ইশারা করবে, বসে পড়ুন। সওয়ারি তুলতে তুলতে যাবে। প্রায় চার কিলোমিটার রাস্তা। অথচ মাত্র কুড়ি টাকায় পৌঁছে যাবেন। নারিয়া রোডের চৌমাথায় কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ফটক—লঙ্কা গেট। ওখানেই নেমে পড়বেন টোটো থেকে। আরেকটা নিতে হবে। ওটা ওই ফটকের পাশেই পাবেন। এখানেও একই গল্প। যদি চট করে ‘ভিটি’ বা ‘বিশ্বনাথ টেম্পল’ যাব বলে বসে পড়েন, দশ টাকায় হয়ে যাবে। টোটো নিয়ে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের নতুন বিশ্বনাথ মন্দিরের কাছে। এখানে একেবারে গর্ভগৃহে বিশ্বনাথকে স্পর্শ করে নিজের মতো করে যা চাওয়ার চেয়ে নিতে পারেন।
চাইতে গেলে যদি মন খুঁতখুঁত করে, জায়গা দেবেন না। এটা কাশী। এখানে যুক্তি আর বিশ্বাস দুই পাশাপাশি স্রোত একই দিকে বয়ে চলে। বাবা বিশ্বনাথ কাউকে ফেরান না। আজ অবধি তো ফেরাননি।
ওই বিশ্বাসেই ভর করে রাত সাড়ে দশটাতেও নিশ্চিন্তে চলে যাওয়া যায় দশাশ্বমেধ ঘাটে। গোধুলিয়ার ভিড় একটু পাতলা হয়েছে। চারমাথা থেকে ঘাটের দিকে রাস্তাটা শান বাঁধানো। সন্ধেতে ভিড়ে চলা দায় হয়। দু’পাশে দোকানের সারি। আলো ঝলমল। সারা বছর এখানে দীপাবলি। রাত সাড়ে ন’টা অবধি তাই চলে। এত রাতে অবশ্য সব দোকানের ঝাঁপ পড়ে যায়। কিন্তু লোক চলাচল দিব্যি। দশাশ্বমেধের সিঁড়ির পাশে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে অনেকেই।
ঘাট প্রায় শুনশান। কিন্তু একটু তাকালেই অবাক হবেন। বহু লোক ঘাটের নানা নিরিবিলি কোণে চুপচাপ বসে আছেন। গল্পগাছা, আড্ডা, আলাপ সবই চলছে। আছে যুগল, আছে বহু বিদেশী পর্যটক। রাত পৌনে এগারোটাতেও কেদার ঘাট, রাজা ঘাট, অহল্যাবাই ঘাট, মুনশি ঘাট, দ্বারভাঙা ঘাটে শ্বেতাঙ্গ পর্যটকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘোরাফেরা করছেন।
‘কোনও ভয় নেই এখানে’, দেঁতো হাসলেন এক অটোচালক, ‘এখন সব ঠিকঠাক। যোগীজি আছেন তো। আগে কোনও ঠিক ছিল না। সব ঘুষখোরে ভর্তি ছিল। পুলিশ টুলিশ কাজ করত না, সমাজবিরোধীরা ছিল। যোগীজি এসে সব ঠিক করে দিয়েছেন। এখন মাঝরাতেও কেউ ঘুরতে পারে। গায়ে হাত উঠলে তাকে আর পাওয়া যাবে না!’
কলকাতায় বসে উত্তরপ্রদেশের নানা দমন পীড়নের গল্প শুনে যতই ‘যোগীরাজ্যে আইনের শাসন কোথায়’ বলে প্রশ্ন তুলি না কেন, যোগীরাজ্যের প্রজাদের মনে ওটাই আইনের শাসনের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। বোধ হয় যস্মিন দেশে যদাচারঃ বলেই। অবশ্য ফলও তো মিলছে। কাশীতে বিদেশি পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু এবারে যা আধিক্য দেখা গেল, সেটা বোধ হয় সংখ্যার বিচারেও অপ্রত্যাশিত। পর্যটকদের নিয়ে রীতিমত বড় বড় ভ্রমণসংস্থার বাস ঘুরছে শহর জুড়ে। ক্যাফে-রেস্তোরাঁয় ঢুকলেও দেখা যাবে সেই ছবি। গোটা কাশীতে দ্বিতীয় কোনও রাজনৈতিক দলের চিহ্ন নেই। সমাজবাদী পার্টি, কংগ্রেস সবই সেখানে সামান্য! এক ও অদ্বিতীয় রাজ পদ্মের।
আর ঠিক ততটাই কমেছে বাঙালি। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ পড়লে এখন কেমন অচেনা ঠেকবে। গল্পে বাঙালিদের আধিক্য, হোটেল মালিক থেকে কাশীবাসী সবাই। অথচ আজকের কাশীতে গোধুলিয়া থেকে বেরিয়ে বাঙালিটোলা ইস্কুল চোখে পড়বে। বিশ্বনাথের গলিতে তিরিশ বছরের পুরনো বাঙালির জর্দার দোকান পাবেন। সোনারপুরায় বেনারসি শাড়ি দর করতে গেলেও বাঙালি দোকানদার পাবেন। লঙ্কার মোড়ে সন্ধের দিকটায় ঘুরলে এক বয়স্ক বাঙালি চা-ওয়ালাকেও পেতে পারেন। হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে একেবারে পুরোদস্তুর বাংলা বিভাগও পেয়ে যাবেন। কিন্তু কাশীর আনাচে-কানাচে যে বাঙালি মহল্লার রেশ আমাদের কাশীবাসকে ঘরে ফেরার মতোই করে তুলত অ্যাদ্দিন, তাতে যেন কোথাও ভাঁটা পড়েছে। কাশীর বাঙালি, প্রবাসী বাঙালি বিশেষণগুলোর ওপর বালির চড়া পড়ে গিয়েছে কালের নিয়মে।
যেমন পড়েছে গঙ্গার ওপর। এসেছে উন্নয়নের জোয়ার। গঙ্গাবক্ষে কাজ করছে জেসিবি। ঢেলে সাজানো হচ্ছে নদীতীর। উত্তর ভারতের প্রাণভোমরা আজ কাশীতে এসে খানিক থতমত। সন্ধেয় রাঙা আকাশের নীচে ছায়ার মতো দেখা যায় রেলের ব্রিজ। আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী কেন্দ্র।