কেদারনাথ-সহ চারধাম যাত্রায় হেলিকপ্টারের চাহিদা তুঙ্গে। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি নিয়ে। সরকারি তত্ত্বাবধানে অনিয়ম আর কালোবাজারি মিলিয়ে আতঙ্ক বাড়ছে।

কেদারে বাড়ছে কপ্টার।
শেষ আপডেট: 19 June 2025 13:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চেন্নাইয়ের মীনাক্ষী মন্দির থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশের মহাকুম্ভ পর্যন্ত, কোনও তীর্থ বাকি নেই কাপড় ব্যবসায়ী অনিতা শিবদাসানির। শুধু পুণ্য অর্জন নয়, ধর্মীয় সফরগুলিও আলাদা করে উপভোগ করেন এই একনিষ্ঠ ভক্ত ও পর্যটক। দেশের কোনও প্রান্তেই পৌঁছনো বাকি নেই। তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা? কাচের তলবিশিষ্ট হেলিকপ্টারে কেদারনাথ যাত্রা। যে যাত্রায় একদিকে সবুজ উপত্যকা, অন্যদিকে বরফঢাকা হিমালয় দেখে চোখের পাতা ফেলা যায় না।
শেষ কয়েক বছরে হেলিকপ্টারই হয়ে উঠেছে ভারতের পবিত্র ধর্মস্থানগুলিতে পৌঁছনোর দ্রুততম ও জনপ্রিয় উপায়। কিন্তু গত দেড় মাসে একের পর এক দুর্ঘটনা ও জরুরি অবতরণে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, এই কপ্টার যাত্রায় নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কার্যত অনুপস্থিত।

১৫ জুন কেদারনাথে সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। সাতজন প্রাণ হারিয়েছেন চপার ভেঙে পড়ে। ঘটনাটি যেন নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, এই বিপুল হেলি-পর্যটন সেক্টরে পর্যাপ্ত এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল, রিয়েল-টাইম আবহাওয়া আপডেট বা যথাযথ নজরদারি ব্যবস্থা, কিছুই নেই ।
থমাস কুক এবং SOTC-এর এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট নীরজ সিং দেব জানাচ্ছেন, করোনার আগে ৮০ শতাংশ ধর্মীয় পর্যটক বাসে করে যেতেন কেদারে। এখন সেই অনুপাত পুরোপুরি উল্টো, ৮০ শতাংশ যাত্রীই হেলিকপ্টারে যাচ্ছেন।
হেলিকপ্টারে যাত্রা একদিকে যেমন সময় বাঁচায়, তেমনই পরিশ্রম প্রায় হয় না। ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে পড়ে এক রাউন্ড ট্রিপ। চারধাম যাত্রার মধ্যে কেদারনাথ রুট সবচেয়ে জনপ্রিয়, এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে বিপজ্জনকও বটে। গত দেড় মাসে পাঁচটি কপ্টার-সমস্যা এখানে ঘটেছে। তিনটি জরুরি অবতরণ ও দুটি দুর্ঘটনা। এর ফলে DGCA ১৫-১৬ জুন হেলিকপ্টার পরিষেবা স্থগিত রাখে এবং রাজ্যের সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি UCADA-কে নির্দেশ দেয় কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম স্থাপন করতে।

এর আগেও, মে মাসে গঙ্গোত্রীগামী একটি হেলিকপ্টার খাদে পড়ে ৬ জন নিহত হন। সেই ২০২২ সালে কেদারনাথে দুর্ঘটনার পর AAIB রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ATC ও মেট স্টেশন গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু তিন বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
উত্তরাখণ্ডের সমাজকর্মী অনুপ নৌটিয়াল বলেন, এটা দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এয়ার করিডর। এখানে না আছে ব়্যাডার, না আছে ATC, না আছে আবহাওয়া আপডেট। পাইলটরা কার্যত অন্ধভাবে উড়ছেন।

চারধাম যাত্রার আগে একসময় ১২ দিন লেগে যেত বাসে করে, দুর্গম পাহাড়ি পথে। এখন হেলিকপ্টারে তা অনেক কম সময়ে সম্ভব। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য তো বটেই। SOTC-এর জয়পুর অফিসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে 'চারধাম হেলিকপ্টার প্যাকেজ'। প্রতি ব্যক্তির জন্য খরচ ২.২ লাখ টাকা, তাতে থাকছে হেলিকপ্টারে চারধাম, পাঁচ রাতের আবাসন, সব খাবার ও দর্শনের সুবিধা।
সরকারি সহযোগিতায় ২০১৮ থেকে UCADA চারটি নির্দিষ্ট রুটে বেসরকারি অপারেটরদের টেন্ডার দেয়। বর্তমানে ৯টি কোম্পানি এই রুটে পরিষেবা দেয়। কিন্তু সমস্যা হল, জোগানকে বহু গুণ ছাড়িয়ে গেছে চাহিদা। ২০২৪-এ প্রায় ২০ লাখ মানুষ কেদারনাথ যান, তার মধ্যে ৫ শতাংশই হেলিকপ্টারের যাত্রী ছিলেন।

রুদ্রপ্রয়াগের জেলা পর্যটন আধিকারিক রাহুল চৌবে বলেন, হেলিকপ্টারের টিকিটের চাহিদা জোগানের তিন-চার গুণ। এর ফলে কালোবাজার ও ভুয়ো টিকিটের জালিয়াতিও বেড়েছে। IRCTC-এর হেলিযাত্রা পোর্টাল ছাড়া বাকি বেশিরভাগ ভুয়ো ও প্রতারণামূলক সাইটে টিকিট বিক্রি হচ্ছে।
কেদারনাথের আকাশে প্রতিদিন গড়ে ২৫০-৩০০ হেলিকপ্টার ওড়ে। আবহাওয়া ভাল থাকলে তা বেড়ে হয় ৪০০। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয়।
বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, 'এখানে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল নেই, নেই আধুনিক নেভিগেশন সিস্টেম। পাইলটদের সবকিছুই চোখে দেখে আন্দাজ করতে হয়।'
২০২২ সালের দুর্ঘটনার পর AAIB যে সুপারিশ করেছিল, ATC, মেট স্টেশন ও সিসিটিভি, তা আংশিক কার্যকর হয়েছে। DGCA হেলিপ্যাডে ক্যামেরা বসিয়েছে, পাইলটদের প্রশিক্ষণ জোরদার করেছে। কিন্তু ATC আজও অধরা।

তাই অভিজ্ঞ পাইলট থাকা সত্ত্বেও, সমস্যা হচ্ছে মালিক, পাইলট ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা। তাঁর কথায়, 'পাইলটরা অনেক সময় 'না' বলতে পারেন না, কারণ তারা যার অধীনে কাজ করেন, তাদের চাপেই চালাতে হয়।'
UCADA-এর তথ্য অনুযায়ী, কেদারনাথ হেলিপ্যাডে প্রতি ল্যান্ডিংয়ে অপারেটরদের থেকে সরকার পায় ৫ হাজার টাকা। গঙ্গারিয়ায় তা ৩ হাজার। অর্থাৎ প্রতিদিন শুধু রয়্যালটি থেকেই ১২.৫-১৫ লক্ষ টাকা আয় হয়। তার সঙ্গে আছে জিএসটি ও অন্যান্য চার্জ।
নৌটিয়ালের মতে, “সরকার শুধু সংখ্যা নিয়ে ব্যস্ত—রেকর্ডসংখ্যক যাত্রী এসেছে। কিন্তু এই যাত্রা নিরাপদ ও টেকসই কি না, তা নিয়ে ভাবছে না কেউ।”

কেদারনাথের মতো দুর্গম তীর্থক্ষেত্রে হেলিকপ্টার পরিষেবা প্রার্থীদের জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনই এটি এখন এক ভয়ানক ঝুঁকির উৎসও হয়ে উঠছে। চাহিদার তুলনায় সীমিত সরবরাহ, অনিয়ন্ত্রিত বাজার, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর অভাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বেসরকারি অপারেটরদের ওপর নির্ভরশীল এই পরিষেবার রাজস্বে সরকার লাভের মুখ দেখলেও, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সেই লাভ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।
একটি নিরাপদ, টেকসই ও পুণ্যার্থীবান্ধব হেলিকপ্টার যাত্রার জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো, বাস্তবমুখী নীতি এবং পরিকাঠামোগত বিনিয়োগ। পবিত্র গন্তব্যে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা যেন কোনোভাবেই জীবননাশের পথে না যায়, সেই দায় প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের এখনই নিতে হবে।