হরজিৎ এখনও মানতে পারছেন না যে, তাঁকে শুধু দেশ থেকে নয়, তাঁর পরিবারের থেকেও সমূলে উৎখাত করে ভারতে পাঠানো হয়েছে।

হরজিৎ কৌর
শেষ আপডেট: 27 September 2025 18:01
দ্য় ওয়াল ব্যুরো: আজ থেকে ৩০ বছর আগে হরজিৎ কৌর (Harjit Kaur) যখন তার দুই ছেলে নিয়ে আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন, কখনও তাঁর কল্পনাতেও আসেনি যে একদিন এমন কোনও পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। পাঞ্জাবের আদি বাসিন্দা হরজিৎ ক্যালিফোর্নিয়ার খাতায় অবৈধ অভিবাসী (Illegal Immigrant)। তিনি সেখানে কাজ করতেন, নিয়মমাফিক ট্যাক্স দিয়েছেন এবং ছয় মাস অন্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের উপস্থিতি নথিভুক্ত করিয়েছেন - কারণ সে দেশের আইন তাই বলে।
কিন্তু ২০২৫ সালে এসে সব কিছু যেন ওলটপালট হয়ে গেল। ৭৩ বছরের এই বৃদ্ধাকে দীর্ঘসময় কাস্টডিতে থাকা তাঁকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়। হাতকড়ায় বেঁধে, খাবার-ওষুধ ছাড়াই ফেরত পাঠানো হল ভারতে - সেই দেশ থেকে যেখানে তাঁর জীবনের দীর্ঘ ৩ দশক কেটেছে। তাঁর অপরাধ কী, সেটাও জানেন না বৃদ্ধা।
হরজিৎ এখনও মানতে পারছেন না যে, তাঁকে শুধু দেশ থেকে নয়, তাঁর পরিবারের থেকেও সমূলে উৎখাত করে ভারতে পাঠানো হয়েছে। স্পষ্ট কোনও কারণ না থাকলেও হঠাৎ এত বছর পরে এই সিদ্ধান্তের কারণ আর কিছুই নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসীদের উপর কঠোর নীতি এবং সহমর্মিতার অভাব।
কান্না ধরে রাখার চেষ্টা করতে করতে হরজিৎ বললেন, “আমি ছয় মাস অন্তর উপস্থিতি নথিভুক্ত করতাম। ৮ সেপ্টেম্বর, যখন আমি অফিসে গিয়েছিলাম, ওরা প্রথমে আমাকে দু'ঘণ্টা অপেক্ষা করাল। তারপর আমাকে একটি কাগজে সই করতে বলল। আমি আইনজীবীর অনুমতি ছাড়া কোনও কাগজেই সই করতে চাইনি। কর্মকর্তারা তখন আমাকে জানান, তাঁদের কাছে আমার আঙুলের ছাপ রয়েছে। ওঁরা আমাকে গ্রেফতার করলেও কোনও কারণ জানায়নি।”
এখনও পর্যন্ত যে ২,৪০০ জন ভারতীয়কে আমেরিকা থেকে এ দেশে পাঠানো হয়েছে, হারজিৎ কৌর তাঁদের মধ্যে একজন। ফেফাজতে রাখার সময় এক ইউনিফর্ম দিয়েছিল আমেরিকা থেকে, দুই দিন আগে যখন ভারতের মাটিতে পা রাখেন পরনে ছিল সেই পোশাক। নাতি তাঁকে দেখে বলেছিলেন, "আমি তোমাকে এই পোশাকে দেখতে পারছি না।" সেই সময়ের যন্ত্রণা মনে করে আবেগে ভেঙে পড়েন বৃদ্ধা।
“আমাকে আমার ওষুধ দেওয়া হয়নি। আমি মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমিয়েছি। গ্রেফতার হওয়ার দিন আমি সারারাত বসতে পারিনি। একটি মেয়ে, সে পাঞ্জাবের বাসিন্দা, আমাকে শুতে বলেছিল, আমি রাজি হয়েছিলাম, কিন্তু পরের দিন সকালে উঠতে পারিনি।”
হারজিতের আইনজীবী দীপক আলুওয়ালিয়া অভিযোগ করেছেন যে, বৃদ্ধাকে ডিটেনশন সেন্টারে প্রাথমিক সুবিধাটুকুও দেওয়া হয়নি। তিনি মেঝেতে শুতে বাধ্য হয়েছিলেন, স্নান পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি এবং যাত্রীবাহী বিমান না ব্যবহার করে ছোট একটি চার্টার্ড প্লেনে ভারতে ফেরানো হয়েছে।
শুধু তাই নয়, কঠোর নিরামিশাষী হারজিৎকে বেশ কিছু দিন শুধু আমিষ খাবার খেতে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমি তা খেতে পারিনি, টার্কি দিয়েছিল ওরা। রুটি ছিঁড়তে পারিনি, শুধু চিপস এবং বিস্কুটই সম্বল ছিল।”
একবার আমিষ খাবার প্রত্যাখ্যান করায় একটি প্লেটে বরফ দেওয়া হয়েছিল খেতে, জায়গাও এত ছোট ছিল যে, বসার পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল না।
হারজিৎ কৌর ১৯৯২ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর আমেরিকা যান। একা মা, দুই ছেলের সঙ্গে তিনি নর্থ ক্যালিফোর্নিয়ার ইস্ট বে এলাকায় থাকতেন। তাঁর পুত্রবধূ মনজি কৌর জানিয়েছেন, তিনি “নিয়মমাফিক ICE-তে উপস্থিতি দিতেন।” ২০১২ সালে তাঁর আশ্রয় অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হলেও তিনি কখনও অভিবাসন কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হওয়া থেকে বিরত থাকেননি।
ভারতে ফেরার পর কয়েকটা দিন কেটে গিয়েছে, হারজিৎ কৌর এখনও জানেন না কেন সাধারণ এবং নিয়মমাফিক হাজিরার সময় তাকে হঠাৎ গ্রেফতার করা হল।
একটা করে দিন কাটছে ঠিকই, সময় তাঁর থমকে আছে ও দেশেই, যেখানে নিজের জীবনের তিনটি দশক কেটেছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জীবনের কাছে শুধু একমাত্র চাওয়া ৭৩ বছরের বৃদ্ধার - “আমাকে আমার পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হোক।”