তামিলনাড়ু থেকে রবি বিদায় তিক্ততাকে সঙ্গী করে। তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়েছিল রবিকে রাজ্য থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁকেই পাঠাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপাল করে।

শেষ আপডেট: 6 March 2026 08:24
বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় সরকার যে নয় রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের রাজ্যপাল-উপ রাজ্যপালদের অদল বদল করেছে তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত চরিত্র রবীন্দ্র নারায়ণ রবি বা আরএন রবি। নাগাল্যান্ড এবং ও অল্প সময়ে মেঘালয় রাজ্যপালের দায়িত্ব পালন করা এই প্রাক্তন আইপিএস অফিসার ২০২১ সাল থেকে তামিলনাড়ুর রাজভবনে কর্তব্যরত ছিলেন। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইবি'র সাবেক অধিকর্তা এবং জাতীয় উপ নিরাপত্তা উপদেষ্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করা এই আইপিএস অফিসারকে তামিলনাড়ুতে রাজ্যপাল করে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পেছনে প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল নিরাপত্তা। ভারতের দক্ষিণ উপকূলের নিরাপত্তার প্রশ্নে তামিলনাড়ু একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। ওই রাজ্যে এখনও শ্রীলঙ্কার নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন এলটিটিই সক্রিয় বলে খবর। সেই তামিলনাড়ু থেকে রবি বিদায় তিক্ততাকে সঙ্গী করে। তামিলনাড়ুর ডিএমকে সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়েছিল রবিকে রাজ্য থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁকেই পাঠাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যপাল করে।
প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল থাকাকালীন তাঁর কার্যকলাপ নিয়ে তুমুল বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে একসময়ের রাজভবন এবং নবান্নের মধ্যে যোগাযোগ একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। বহু গুরুত্বপূর্ণ দিনে রাজভবনের অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজ্যপাল হিসেবে ধনকড়ের বিরুদ্ধে বিধানসভায় পাশ হওয়া বিল আটকে রাখা থেকে শুরু করে অধিবেশন ডাকা নিয়ে গড়িমসি, নবনিযুক্ত বিধায়কদের শপথ পাঠে বিধানসভার স্পিকারের ক্ষমতা খর্ব করার মতো গুচ্ছ অভিযোগ উঠেছিল। আরও অভিযোগ ছিল তিনি রাজভবনে বসে সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে বড় সংঘাত বেধেছিল শিক্ষাক্ষেত্রে উপাচার্যদের নিয়োগ আটকে দিয়ে।
ঘটনা হল, ধনকড় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল থাকার সময় তামিলনাড়ুর দায়িত্বপ্রাপ্ত রবিকে সংশ্লিষ্ট মহলে বলা হত 'দ্বিতীয় ধনকড়'। তামিলনাড়ুর ডিএমএমকে সরকার রাজ্যপাল সম্পর্কে সেই সব অভিযোগ তুলেছিল যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছিলেন ধনকড়ের বিরুদ্ধে। তবে শেষ পর্যন্ত রবি তাঁর সমসাময়িক বাকি সব রাজ্যপালকে ছাপিয়ে যান রাজ্য বিধানসভায় পাশ হওয়া বিল আটকে দিয়ে। একসঙ্গে ১২টি বিল তিন বছর ধরে রাজ্যপালের দফতরে আটকে রেখেছিলেন রবি। প্রশাসনিক মহলের খবর দেশের কোনও রাজ্যে কোনও রাজ্যপালের বিরুদ্ধে এত বিল আটকে রাখার নজির অতীতে নেই। বিলগুলিতে রাজ্যপালের সম্মতি আদায়ে ডিএমকে সরকার একপর্যায়ে রবির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে।
সংশ্লিষ্ট মামলাগুলিতে দেশের শীর্ষ আদালত তিনবার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী আরএন রবিকে ভৎসনা করে তাঁর আচরণ ও সিদ্ধান্তের জন্য। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয় রাজ্যপাল বিল আটকে দেওয়ার স্বপক্ষে কোনও গুরুত্বপূর্ণ কারণ পেশ করতে পারেননি। তার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্কের পরিপন্থী বলেও সর্বোচ্চ আদালত মন্তব্য করে। বিচার মহল এবং আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে অতীতে ভারতে কোন রাজ্যপালের বিরুদ্ধে এইভাবে সুপ্রিম কোর্টকে কঠোর মনোভাব নিতে হয়নি।
তামিলনাড়ুর পাশাপাশি একই সময়ে তেলেঙ্গনা, কেরল ও পাঞ্জাবের রাজ্যপালদের বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। কিন্তু তামিলনাড়ুর মামলা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। একপর্যায়ে শীর্ষ আদালত আরএন রবিকে সময় বেঁধে দিয়েছিল বকেয়া বিলগুলিতে সম্মতি দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে।
শুধু বিল আটকে দেওয়াই নয়, রবির বিরুদ্ধে তামিলনাড়ুর নাম বদলে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ তুলেছিল ডিএমকে সরকার। ২০২৩-এর মাঝামাঝি চেন্নাইয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের এক অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল সম্পর্কে নিজেকে 'তামিঝাগা আলুনার' বলে পরিচয় দেন। এর অর্থ তিনি তামিঝামের রাজ্যপাল। ভাষণে দাবি করেন তামিলনাড়ু নয় এই প্রদেশে যথার্থ নাম হল তামিঝগম।
রাজ্যপালের ওই বক্তব্য নিয়ে তুমুল বিতর্ক দেখা দেয় তামিলনাড়ু জুড়ে। মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিন অভিযোগ করেন, রাজ্যপাল রাজ্যের নাম বদলে দিতে চাইছেন। বিতর্কের এক পর্যায়ে রাজ্যপাল তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, ইতিহাস নিয়ে সম্মেলনে তিনি ইতিহাসের কথা তুলে ধরেছিলেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে এই রাজ্যের নাম আসলে তামিলঝগম হওয়া উচিত।
রবির আর এক সিদ্ধান্তে তিনি নিজেও অত্যন্ত বিব্রত বোধ করে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০২৪ এর গোড়ায় তিনি মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনকে চিঠি লিখে একজন মন্ত্রীকে বরখাস্ত করার পরামর্শ দেন। রাজ্যপালের ওই চিঠি নিয়ে সব মহলেই প্রশ্ন ওঠে। রাজ্যপাল কোনও মন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে রাজ্য সরকারকে পরামর্শ দিতে পারেন কিনা এই সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে বেজায় উত্তেজিত মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিন সেই সন্ধ্যায় ফোন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। সেদিনই রাত বারোটায় রাজভবন এক বিবৃতি দিয়ে জানায় মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা রাজ্যপালের চিঠিটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হল। এই বিষয়ে আর কোন আলোচনা, বিতর্ক অনাকাঙ্ক্ষিত। বিষয়টির এখানেই ইতি টানা হল।
পরে জানা যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ফোন করে রবিকে এই ব্যাপারে সতর্ক করেন। কেন্দ্রীয় সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছিল যে রাজ্যপাল কখনও মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে পারেন না কোন মন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে।