পূর্ব সিকিমের নাথুলা, জুলুক ও নাথাং ভ্যালিতে হিমবাহ ধসের সতর্কতা জারি। ভারী বৃষ্টি ও তুষারপাতের মাঝে প্রশাসন ও সেনা প্রস্তুত, সান্দাকফুতে আটকে পর্যটক।

ফাইল চিত্র
শেষ আপডেট: 22 March 2026 09:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে, ২০২৩ সালে সিকিমের সাউথ লোনাক লেক বিপর্যয় এখনও পাহাড়ি মানুষের মনে আতঙ্ক জাগায়। সেই স্মৃতি মুছে যাওয়ার আগেই ফের নতুন আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়েছে পূর্ব সিকিমে। হিমবাহ ধসের সম্ভাবনা (Glacier avalanche alert in Sikkim) ঘিরে জারি হয়েছে সতর্কতা, আর তাতেই উদ্বেগ বেড়েছে প্রশাসনের অন্দরমহলে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় নাথুলা, জুলুক (Nathula and Zuluk areas) ও নাথাং ভ্যালি এলাকায় হিমবাহে ধস নামতে পারে বলে জানানো হয়েছে, ফলে দ্রুত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে প্রশাসন ও সেনা।

‘ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এস্টাবলিশমেন্ট’ (ডিআরডিই) এবং সিকিমের বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের তরফে এই হিমবাহ ধসের পূর্বাভাস জারি করা হয়েছে। পূর্ব সিকিমের নাথুলা, জুলুক এবং নাথাং ভ্যালিকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। গ্যাংটক ও পাকিয়ং প্রশাসনকে যে কোনও পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে সিকিমে হিমবাহ ধসের তেমন কোনও ঘটনা ঘটেনি বা আগাম সতর্কতাও জারি করা হয়নি, ফলে এই হঠাৎ পূর্বাভাস প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিপরীত ঘূর্ণাবর্ত এবং পশ্চিমী ঝঞ্ঝা মিলিয়ে হিমালয় সংলগ্ন এলাকাগুলিতে এক অস্বাভাবিক আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। গত শুক্রবার থেকে সিকিম, দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলায় লাগাতার ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তার সঙ্গে শিলাবৃষ্টি, তুষারপাত এবং ঝড়—এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার রাতভর উত্তর সিকিমের লাচুং ও লাচেনে তুষারপাত হয়েছে। একইভাবে পূর্ব সিকিমের নাথুলা, ছাঙ্গু ও জুলুকেও পুরু বরফে ঢেকে গিয়েছে রাস্তা ও পাহাড়ি এলাকা। তুষারপাতের প্রভাব পড়েছে দার্জিলিংয়েও। সান্দাকফু ও ফালুটে ভারী স্নো-ফলের জেরে পুরু বরফ জমে গিয়েছে। মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে প্রায় পঞ্চাশ জন পর্যটক আটকে পড়েছেন। তবে প্রশাসন জানিয়েছে, সকলেই নিরাপদে রয়েছেন। বরফ গলে রাস্তা পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের শিলিগুড়িতে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়।
কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রবিবার দুপুরের পর থেকে আবহাওয়ার উন্নতি হতে পারে। পরিস্থিতি অনুকূল হলে সোমবার পর্যটকদের সান্দাকফু থেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও শনিবারও পাহাড়ে বৃষ্টি ও তুষারপাত অব্যাহত ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে পূর্ব সিকিমে হিমবাহ ধসের সতর্কতা জারি হওয়ায় সিকিমের পাশাপাশি দার্জিলিং প্রশাসনের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ মার্চ বঙ্গোপসাগরে একটি বিপরীত ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়, যার ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প সিকিম ও দার্জিলিংয়ের হিমালয় এলাকায় প্রবেশ করতে শুরু করে। এর জেরে গত কয়েক দিন ধরে দার্জিলিং, কালিম্পং ও সিকিমে শিলাবৃষ্টি ও ঝড় দেখা দিয়েছে।
এরই মধ্যে ১৭ মার্চ তৈরি হয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝা, যার প্রভাবে কাশ্মীর থেকে অরুণাচল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি ও তুষারপাতের সতর্কতা জারি করা হয়। এই দুই আবহাওয়াগত প্রভাব একসঙ্গে সক্রিয় থাকায় হিমবাহ ধসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
নাথুলা এলাকায় মূলত সেনা ছাউনি রয়েছে, ফলে সেখানে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে নাথাং ভ্যালিতে ছোট ছোট পাহাড়ি গ্রাম থাকায় সেখানেও বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই সিকিম প্রশাসন বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে সতর্ক করেছে এবং কর্মীরা ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দিয়েছেন। সেনাও প্রস্তুত রয়েছে যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য।

কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের গ্যাংটক শাখার অধিকর্তা গোপীনাথ রাহা জানিয়েছেন, শনিবার রাতেও এই এলাকায় ভারী বৃষ্টি ও তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রবিবার দুপুরের পর থেকে আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।