পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারে, পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছিল।

শেষ আপডেট: 5 February 2026 08:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তরপ্রদেশের (Uttar Pradesh) গাজিয়াবাদে ফ্ল্যাটের ন’তলা থেকে পড়ে তিন বোনের মৃত্যুর ঘটনা (Ghaziabad three sisters death) তদন্তকারীদের একের পর এক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। চিন্তা আরও বেড়েছে কারণ তাদের প্রত্যেকেরই বয়স ১৬ বছরের নীচে।
বুধবার সকালে তিন কিশোরীর বাবা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছিলেন, একটি কোরিয়ান ‘গেম’-এর টাস্ক (Korean game task) করতে গিয়েই শেষ ধাপে আত্মহত্যা করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যার মধ্যেই পুলিশ জানিয়ে দেয়, এমন কোনও গেমের প্রভাবের প্রমাণ তারা পায়নি (Suicide investigation)। বরং তিন বোন মা বা বাবার মোবাইল হাতে পেলেই কোরিয়ান শো একটানা দেখত - তদন্তে এমনটাই উঠে এসেছে।
পুলিশের মতে, অত্যন্ত আবেগঘন 'কোরিয়ান ড্রামা' (Korean drama)-র প্রভাব একেবারে উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও, পরিবারের ভিতরের আরও একটা বড় সমস্যা সামনে এসেছে, তা হল মোটা অঙ্কের ঋণ। মৃত কিশোরীদের বাবা চেতন কুমার পেশায় শেয়ার ব্যবসায়ী, তাঁর উপর ছিল প্রায় ২ কোটি টাকার ঋণের বোঝা (Rs 2 crore debt police probe)।
পুলিশ জানায়, বিদ্যুতের বিল মেটাতে তিনি মেয়েদের মোবাইল বিক্রি করে দেন। এমনকী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিতেন। গত সপ্তাহে তিনি নিজের মোবাইলও তিন মেয়েকে দেওয়া বন্ধ করে দেন। তদন্তকারীদের ধারণা, কোরিয়ান সিরিজে ডুবে থাকা তিন কিশোরী বাবার এই আচরণে গভীরভাবে আঘাত পায়।
চেতন কুমারের দুটি স্ত্রী। দ্বিতীয় স্ত্রী প্রথম স্ত্রীরই বোন। প্রথম পক্ষের এক ছেলে ও এক মেয়ে, দ্বিতীয় পক্ষের তিন মেয়ে - এই ছিল পরিবার। প্রথম বিয়ের ১৭ বছর পর তিনি স্ত্রীর ছোট বোনকে বিয়ে করেন।
পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারে, পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়েছিল। বিদ্যুতের বিল মেটাতে মোবাইল বিক্রি করা ছাড়াও, কোভিড পরিস্থিতি কাটার পরও মেয়েদের আর স্কুলে পাঠানো হয়নি। কারণ হিসেবে উঠে আসে বিপুল ঋণের চাপ। সেই থেকে আর তাদের পড়াশোনা শুরু হয়নি।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের সন্দেহ, একাধিক কারণ মিলেই তিন কিশোরীর মনে তীব্র হতাশা তৈরি হয়েছিল। মোবাইলের প্রতি নির্ভরতা, আবেগপ্রবণ কোরিয়ান ধারাবাহিকের প্রভাব, স্কুলে না যাওয়া, আর তার সঙ্গে ২ কোটির ঋণে জর্জরিত পরিবার - এসবই উঠে আসছে তদন্তে।
প্রথম পক্ষের ১৪ বছরের এক ছেলে মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী। তাকে দেখাশোনার দায়ও পরিবারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছিল বলে পুলিশের ধারণা।
ঘটনাক্রম কী বলছে?
কোভিড পরিস্থিতি একটু থিতু হওয়ার সময়, প্রায় তিন বছর আগে পরিবারটি গাজিয়াবাদের একটি বহুতল আবাসনের দু'কামরার ফ্ল্যাটে ওঠে। বুধবার ভোর ২টো নাগাদ কয়েকজন বাসিন্দা কংক্রিটে ভারী কিছু পড়ার মতো শব্দ শুনতে পান। এক মুহূর্তে আবাসন জেগে ওঠে, চারদিকে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা অরুণ সিং জানান, তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন গভীর রাতে তিন বোনকে দেখতে পান। তাঁর কথায়, সম্ভবত বড় বোনটি ধীরে ধীরে প্রান্তের দিকে এগোচ্ছিল। বাকি দুই বোন তাকে টানার চেষ্টা করছিল।
তিনি আরও জানান, বড় বোনটির মুখ ঘরের দিকে ছিল, পিঠ বাইরের দিকে। সবচেয়ে ছোট বোনটি বড় বোনের কোমর জড়িয়ে ধরেছিল, আর মাঝের বোনটি হাত ধরে ছিল। তারপর আচমকাই তিনজনই নিচে পড়ে যায়।
“আমরা সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুল্যান্স ডাকি। কিন্তু সেটি আসতে এক ঘণ্টা লেগে যায়,” বলেন তিনি।
পুলিশের তল্লাশি
পুলিশ জানায়, মেয়েদের ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। দরজা ভেঙে ঢুকতে হয়। ঘরের ভিতরে কবিতার লাইন ও সিনেমার সংলাপের মতো কিছু লেখা পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যদের একাধিক ছবি গোল করে সাজানো ছিল।
একটি আট পাতার ছোট নোটবুকও উদ্ধার হয়। সেখানে লেখা ছিল - ডায়েরিটি পড়তে, কারণ তাতে ‘সব সত্যি’ লেখা আছে।
আরও একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়, যার ওয়ালপেপারে তিন বোনের ছবি ছিল। তারা নিজেদের কোরিয়ান নামও দিয়েছিল, যা সেই ডিজিটাল ওয়ালপেপারে লেখা ছিল।
চেতন কুমার পুলিশকে জানান, গাজিয়াবাদে আসার আগে তিনি উত্তর-পূর্ব দিল্লির খাজুরি খাসে থাকতেন।
যদিও পুলিশ নিশ্চিতভাবে মনে করছে না যে কোনও ‘ভয়ংকর গেম’-এর টাস্ক করতে গিয়েই এই মৃত্যু, তবু ২০১৭ সালে মুম্বইয়ে ‘ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ’-এর প্রভাবে ১৪ বছরের এক কিশোরের আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য তারা দেখছে।