গুজরাতের ৩ ফুট উচ্চতার গণেশ বারাইয়ার এমবিবিএস পড়া থেকে চিকিৎসক হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ আইনি লড়াই যেন এক গল্পের মতো।

গণেশ বারাইয়া
শেষ আপডেট: 2 December 2025 12:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাত্র তিন ফুট উচ্চতা, ওজন মোটে ২০ কেজি। ডাক্তারি পরিভাষায় ডোয়ার্ফিজম বা বামনত্বের কারণে ৭২ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। এই সব বাধা পেরিয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছেন তিনি। ২৫ বছর বয়সে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছেন। শুধু যোগ দেওয়াই নয়, দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায়! এভাবেই অসম্ভবকে সম্ভব করে, গুজরাতের ভাবনগর জেলার গোরখি গ্রামের তরুণ, মাত্র তিন ফুট উচ্চতার গণেশ বারাইয়া আজ দেশের চোখে অনুপ্রেরণার প্রতীক।
গণেশের (Ganesh Baraiya) জন্ম কৃষক পরিবারে। সাত বোন আর এক ছোট ভাই নিয়ে মোট নয় ভাইবোনের সংসারে তিনি একজন। এখনও কাঁচা বাড়িতে থাকে তাঁর পরিবার। পরিবারের অভাব ঘোচাতে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হয়েছেন তিনি। তবে এই পথে ছিল হাজারো বাধা। এবার সে সব পেরিয়ে চিকিৎসকের দায়িত্ব শুরু করলেও তাঁর প্রথম লক্ষ্য খুব স্পষ্ট— পরিবারের জন্য একটি ইটের পাকা বাড়ি তৈরি করা। তাঁর কথায়, “অনেকবার টাকার অভাবের জন্য বাড়ির নির্মাণ থেমে গেছে। এবার নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে সেই কাজ শেষ করব।”
#WATCH | Bhavnagar, Gujarat: Dr Ganesh Baraiya overcomes legal hurdles being differently abled and works as a medical officer in a civil hospital.
He says, "... My primary education was from my village... I took the NEET UG exam in 2018 but at that time, the Medical Council of… pic.twitter.com/K2Ai2VeJ8c— ANI (@ANI) December 2, 2025
এমবিবিএস পড়ার অনুমতি না পেয়ে শুরু আইনি সংগ্রাম
গণেশের চিকিৎসক হওয়ার পথ মোটেই সহজ ছিল না। ২০১৮ সালে মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (এমসিআই) তাঁকে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি নিতে অস্বীকার করে। এমসিআই-এর যুক্তি ছিল, তাঁর উচ্চতা ও শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি চিকিৎসকের কাজ করতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন গণেশ। তাঁর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. দিলপতভাই কাটারিয়া তাঁকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেন।
প্রথমে গুজরাত হাইকোর্টে মামলা হলেও হাইকোর্ট এমসিআই-এর পক্ষেই রায় দেয়। কিন্তু গণেশ হাল ছাড়েননি। তিনি একইসঙ্গে বি.এসসি কোর্সে ভর্তি হন এবং আইনি লড়াই নিয়ে পৌঁছন সুপ্রিম কোর্টে। চার মাস পর সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, উচ্চতা কোনও বাধা নয়, তাঁকে এমবিবিএস পড়া থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সেই রায়ের পর ২০১৯ সালে তিনি ভাবনগর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান।
কলেজে সংগ্রাম ও সহপাঠীদের ভূমিকা
শরীরের সীমাবদ্ধতার কারণে ক্লাসে এগিয়ে থাকা কঠিন ছিল গণেশের পক্ষে। কিন্তু তিনি জানিয়েছেন, তাঁর সহপাঠী ও শিক্ষকরাই ছিলেন শক্তির উৎস। অ্যানাটমি ক্লাসে সামনে বসার জায়গা রাখা, সার্জারির প্রশিক্ষণে অপারেশন টেবিল দেখতে সাহায্য করা— সব কিছুতেই তাঁরা গণেশের পাশে ছিলেন। গণেশ বলেন, “তাঁরা আমার উচ্চতাকে কখনই সমস্যা হতে দেননি। যা কিছু প্রয়োজন, সবেতেই সাহায্য করেছেন।”
চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা প্রথমে তাঁর চেহারা দেখে চমকে যান। কিন্তু তাঁর গল্প শোনার পরই তাঁদের বিশ্বাস আরও গভীর হয়। গণেশ বলেন, “সবাই শুরুতে অবাক হন। পরে যখন জানেন আমি কী লড়াই করে এখানে পৌঁছেছি, তখন পুরো আস্থা রাখেন।”
ডিগ্রি সম্পূর্ণ করে শুরু সরকারি দায়িত্ব
এমবিবিএস ও ইন্টার্নশিপ শেষ করে এখন তিনি সরকারিভাবে মেডিক্যাল অফিসার। ভবিষ্যতে শিশু বিভাগ, ত্বকবিদ্যা বা রেডিওলজির মতো কোনও বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার ইচ্ছা তাঁর। তাঁর কথায়, “আমি গ্রামের গরিব মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। সেখানেই দরকার সবচেয়ে বেশি।” তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে খাটো উচ্চতার ডাক্তার হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
গণেশ নিজেই স্বীকার করেন— মানুষ প্রথমবার তাঁকে দেখে খানিকটা অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু এরপরই তাঁদের আচরণ বদলে যায়। গণেশ বলেন, “রোগীরা প্রথমে চমকে ওঠেন। পরে খুবই সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করেন। তাঁদের সেই আন্তরিকতাই আমাকে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসার বন্যা
গণেশের এই যাত্রা প্রকাশ্যে আসতেই নেটমাধ্যমে প্রশংসার জোয়ার। কেউ লিখেছেন, “ওর আরও অনেক সাফল্য দেখুক দেশ।” অন্য কেউ বলেছেন, “সব বাধাকে হারানোর এক সত্যিকারের নায়ক।” প্রশাসনের ধীরগতি নিয়ে সমালোচনাও এসেছে, “দুর্ভাগ্যজনক যে সুপ্রিম কোর্ট না বললে এ ধরনের ক্ষেত্রে সমাধান হয় না।” আবার অনেকে তাঁকে “জীবন্ত রোল মডেল” বলে অভিহিত করেছেন। সব মিলিয়ে, দেশের মানুষ, চিকিৎসা-ব্যবস্থা আর আইন— সব মিলিয়ে গণেশ বারাইয়ার জীবনযুদ্ধ আজ দেশের কাছে দৃঢ়তার এক অনন্য উদাহরণ।