সাধারণ ডিম বিক্রি হয় ৬ টাকায়, এই 'ভ্যালু–অ্যাডেড' বা হার্বাল ডিমের দাম ৯ থেকে ১৬ টাকা হয়। শুধু স্বাস্থ্য সচেতন মানুষই নয়, অনেকেই যাঁদের সাধারণ ডিমে অ্যালার্জি, তাঁরাও এই ডিম খেতে পারছেন।

গ্রাফিক্স- দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 11 October 2025 16:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভোরের আলো পড়তেই ভোপালের বিমানবন্দর থেকে মাত্র কুড়ি মিনিট দূরের এইন্ত খেদি গ্রামের আদিত্য গুপ্তার মুরগির খামারে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। প্রায় ৬ হাজার মুরগি খাবারের অপেক্ষা করে। খাঁচার সামনে একটি লম্বা ধাতব ট্রে করে ছড়িয়ে দেওয়া হয় খাবার। কিন্তু তা কেবল ভুট্টা বা কোনও দানা নয়- সেই খাবারে মেশানো থাকে- তুলসি, হলুদ, অশ্বগন্ধা, অরিগ্যানো, পার্সলে, থাইম, স্পিরুলিনা, পুদিনা- একেবারে আয়ুর্বেদিক। খামারের মালিক আদিত্য গুপ্তা (Bhopal's Aditya Gupta) জানিয়েছেন, 'এই খাবারই তাদের ভেষজ ডিম (Herbal Eggs) দিতে সাহায্য করে।' যা এখন ভারতের নতুন হেলথ ট্রেণ্ড।
আদিত্য আরও বলেন, 'আমরা ২৫০ রকমের ভেষজ দিই। কিন্তু সব নাম বলব না, এটা আমাদের গোপন ফর্মুলা। এই খাবার পেটেন্ট করা।' এই ভেষজ ডিমগুলি সাধারণ ডিমের থেকে আলাদা। গন্ধ কম, পুষ্টিগুণও বেশি। এগুলোতে ভাল কোলেস্টেরল বাড়ে, প্রোটিন ও ভিটামিন ডি বেশি থাকে, সঙ্গে ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও। আজকাল অরগানিক বা কর্ন–ফেড ডিমের থেকে 'হার্বাল' ও 'ভ্যালু–অ্যাডেড' ডিমই বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে (herbal egg benefits)।
অ্যামাজন, বিগবাস্কেট, ইনস্টামার্টে একের পর এক নতুন ব্র্যান্ড উঠছে। Eggoz কোম্পানি এক বছরে আয় দ্বিগুণ করে ১৩০ কোটি টাকায় পৌঁছে গেছে, তারা বিক্রি করছে 'হার্বাল ফেড' ডিম। Henfruit ব্র্যান্ড তাদের মুরগিকে নিম, তুলসি, হলুদ খাওয়ায়। Eggnest-এর 'Herbal Promax' নামে লাইন আছে। Abhi Eggs, Good Eggs-এর মতো সংস্থাগুলোও ভিটামিন যোগ করা ডিম বিক্রি করছে।
সাধারণ ডিম বিক্রি হয় ৬ টাকায়, এই 'ভ্যালু–অ্যাডেড' বা হার্বাল ডিমের দাম ৯ থেকে ১৬ টাকা হয়। শুধু স্বাস্থ্য সচেতন মানুষই নয়, অনেকেই যাঁদের সাধারণ ডিমে অ্যালার্জি, তাঁরাও এই ডিম খেতে পারছেন।
হায়দরাবাদের এক পুষ্টিবিদ বলেন, 'ভেষজ খাবার খাওয়ালে ডিমের গুণমান সত্যিই বদলায়। গবেষণা এখনও খুব বেশি নয়, কিন্তু অনেক রিপোর্টে দেখা গেছে হার্বাল ডিম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও কোলেস্টেরল কমায়।'
ন্যাশনাল এগ কো-অর্ডিনেশন কমিটির (NECC)সঞ্জীব চিন্তাওয়ার জানান, এখনও হার্বাল ডিমের বাজার খুব ছোট- মোট ডিমের বাজারের মাত্র ০.১ শতাংশ। কিন্তু এটা নিজের জায়গা তৈরি করছে। ধীরে ধীরে শহর-গ্রাম সব জায়গায় এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
ভোপালের প্রাক্তন সেনা অফিসার ড. শৈলেন্দ্র সিং রানা বলেন, "২০২২ সালে আমি মেনিনজাইটিসে ভুগছিলাম। ওষুধ খেয়ে শরীর দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তাররা বলেছিলেন সুস্থ হতে দু'বছর লাগবে। কিন্তু আমি ছ'মাসেই আগের মতো হয়ে যাই, আর সেটা সম্ভব হয়েছিল এই হার্বাল ডিম খাওয়ার জন্য।"
তিনি প্রতিদিন সেদ্ধ, অমলেট, বা ডিমের কারি খেতেন, একবেলাও বাদ দিতেন না।
সিদ্ধ হওয়া ভেষজ ডিম খোসা ছাড়িয়ে দেখা গেল, কুসুমের রঙ উজ্জ্বল কমলা, নরম আর মোলায়েম। সাধারণ ডিমের সঙ্গে বৈশিষ্ট্যে এটাই পার্থক্য।
আদিত্য গুপ্তা একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। তখন তাঁদের ৬০ হাজার মুরগি ছিল, কিন্তু অনেকে মারা যেত। ২০১৮ সাল থেকেই আয়ুর্বেদ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। মুরগির রোগ অনুযায়ী নানা ভেষজ যোগ করে তিনি পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে থাকেন।
২০২৪ সালের জুনে, তিনি 'হার্বাল ফিডের' পেটেন্ট পান। তাঁর দাবি, এই খাবার মুরগির ডিমকে স্বাভাবিকভাবে কম কোলেস্টেরলযুক্ত ও বেশি ওমেগা–৩ এবং ওমেগা–৭ ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত করে। এই ভেষজ ডিমে ৯০ শতাংশ হজমযোগ্য প্রোটিন আছে।
যদিও বিজ্ঞানীরা বলেন, কাঁচা ডিমে ব্যাকটেরিয়ার ঝুঁকি থাকে, এনিয়ে আদিত্যর দাবি, 'আমাদের ডিমে সংক্রমণ হয় না, কারণ মুরগিদের হলুদ আর অন্যান্য ভেষজ খাওয়ানো হয়।'
অন্য কৃষকদের মতামত
ভোপালের কাছেই আশ্বিন রেড্ডি নামে এক চাষির Reddeggs নামের কোম্পানি প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ ডিম বিক্রি করে। তিনি বলেন, 'হার্বাল ডিম শুধু মার্কেটিং কৌশল। আসল উপকার নেই, শুধু খরচ বাড়ে।'
হায়দরাবাদের আরেক চাষি অরুণ কুমার রেড্ডি কোঠা বলেন, 'হার্বাল বা হাইপ্রোটিন ডিম বলে কিছু নেই। প্রোটিন বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে কিছু পুষ্টিগুণ যেমন ওমেগা–৩ বা ভিটামিন বাড়ানো যায়।'
তিনি নিজের ফার্মে ফ্ল্যাক্স সিড মিশিয়ে পরীক্ষা চালান। "এটা সহজ নয়, কারণ মুরগি, আবহাওয়া, খাদ্যের মান- সব কিছুর ওপর ফলাফল নির্ভর করে", বলেন তিনি। তাঁর প্রিমিয়াম ডিমের দাম প্রতি পিস ১৬ টাকা, সাধারণ ডিম ৫.২০ টাকা।
ভারত এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিম উৎপাদক দেশ। ২০২৪ সালে বাজারমূল্য ২.৩ লক্ষ কোটি টাকা, যা ২০৩৩ সালে পৌঁছাবে ৮.৪ লক্ষ কোটিতে।
৮০–এর দশকে NECC-এর বিখ্যাত স্লোগান ছিল 'সানডে হো বা মানডে, রোজ খাও আন্ডে।' সঞ্জীব চিন্তাওয়ার বলেন, "আমি নিজেও নিরামিষাশী, কিন্তু ডিম খাই। অনিষিক্ত ডিম আসলে নিরামিষই। হার্বাল ডিম এই ধারণা আরও সহজ করছে।"
ভোপালের আদিত্য পোলট্রি ফার্মের গন্ধহীন ডিম এখন এমনকি কঠোর নিরামিষাশীদেরও আকর্ষণ করছে। আদিতি আচার্য, যিনি বাড়িতে পেঁয়াজ–রসুনও ব্যবহার করেন না, এখন নিয়মিত এই ডিম কেনেন, কারণ তাঁর ছেলের প্রোটিনের ঘাটতি হচ্ছিল।
আদিত্য আরও জানিয়েছেন, "আমরা পুরো বাজারের জন্য কাজ করি, বিশেষ কোনও সেগমেন্টের জন্য নয়, আমাদের লক্ষ্য ৯৯.৯৯ শতাংশ বাজার, ০.১ শতাংশ নয়।" তিনি স্বীকার করেন, হার্বাল ডিম এখন ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে, বিশেষত শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে, কারণ এগুলি সহজপাচ্য প্রোটিনের উৎস।