
ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 6 May 2025 10:18
দেশভাগের (after Partition) পর বিগত ৭৮ বছরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মোট চারবার যুদ্ধ (India-Pakistan war) হয়েছে। এরমধ্যে ১৯৪৭-’৪৮, ১৯৬৫ এবং ১৯৭১-এ পুরোদস্তুর যুদ্ধ (full war) হয়। ১৯৯৯-এ কারগিল যুদ্ধকে সমর বিশেষজ্ঞরা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বলে মানেন না। বলেন সংঘাত (conflict)।
কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে আগামীকাল বুধবার সারা দেশে যে যুদ্ধকালীর পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিক মহড়া (civil preparedness) হতে চলেছে, তেমন প্রশিক্ষণ শেষ বার হয়েছিল ৫৪ বছর আগে ১৯৭১-এর যুদ্ধে (1971 war)। কারগিল সংঘাতের সময় এমন নির্দেশ দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। এমনকী ২০০১-এ সংসদে পাক জঙ্গি হামলার পর ভারত সীমান্তে বিপুল সেনা মোতায়েন করলেও নাগরিকদের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে বলা হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী অবশ্য শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের পথে হাঁটেননি।
এবার এখনও ভারত সরকার যুদ্ধ নিয়ে রা কাড়েনি। মনে করা হচ্ছে, যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া যাচাই করে নিতে চাইছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। রাষ্ট্রসংঘের (UNO) মহাসচিব আন্তেনিয় গুতরেশ (Secretary general Antonio Guterres) ভারতীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে ভারত ও পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যে কোনও মূল্যে যুদ্ধ এড়াতে হবে। যুদ্ধ একবার বেঁধে গেলে মহা বিপদ। মনে করা হচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন, ইজরায়েল-প্যালেস্তান যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেও মহাসচিব এমন পরামর্শ দিয়েছেন। ওই দুই যুদ্ধে রাশিয়া ও ইজরায়েল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের পরামর্শ উপেক্ষা করে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধকালীন সময়ে নাগরিকদের কী ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়? সব রাজ্যকেই এই ব্যাপারে সোমবার পাঠানো নির্দেশিকায় করণীয় জানিয়েছে দিল্লির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। রাজ্য রাজ্যে মহড়া পরিচালনার মূল দায়িত্ব অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের। যুদ্ধের সময় শক্রু বিমান হানার খবর পাওয়া মাত্র সাইরেন বাজিয়ে নাগরিকদের সতর্ক করার ব্যবস্থা রাখতে হয়। একাধিক সরকারি সুত্রের খবর, বেশিরভাগ রাজ্যেই সাইরেন ব্যবস্থা তেমন সচল নয়। ১৯৭১-এর পর সেগুলি আর তেমন ব্যবহার হয়নি। একটা সময় পর্যন্ত সেগুলি নিয়মিত বাজানো হত। ক্রমে বন্ধ হয়ে যায়। মূলত থানা, বিডিও অফিস-সহ সরকারি ভবনের ছাদে সাইরেন থাকত।
যুদ্ধে হতাহতদের হাসপাতালে নেওয়া, শুশ্রূষার জন্য অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের স্বেচ্ছাসেবক, হোমগার্ড এবং এনসিসি-র ক্যাডেটদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকায় এই তিন অসামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
রাতে শক্রু বিমান হানার খবর পাওয়া মাত্র আলো নিভিয়ে দ্রুত বিস্তীর্ণ এলাকা ‘ব্ল্যাক আউট’ (black out) বা অন্ধকার করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। মনে করা হচ্ছে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠলে গাড়ির হেডলাইটের উপরের অংশ ঢেকে দেওয়ার নির্দেশ জারি হতে পারে। ১৯৭১-এর যুদ্ধে এই ধরনের নির্দেশিকা জারি হয়েছিল। পাকিস্তানের সীমান্ত লাগোয়া পাঞ্জাবের ফিরোজপুর শহরে ইতিমধ্যে ’৭১-এর যুদ্ধের সময়ে গৃহীত পদক্ষেপগুলির একদফা মহড়া হয়ে গিয়েছে।
৫৪ বছর পর কেন্দ্রীয় সরকার কেন নাগরিকদের প্রস্তুতির নির্দেশ জারি করেছে তা নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। অনেকের প্রশ্ন, কেন্দ্র যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়াতেই কি এমন নির্দেশিকা জারি করা হল? ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ মনে করছে বিষয়টি মোটেই তেমন নাও হতে পারে। যুদ্ধের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি নরেন্দ্র মোদী সরকার।
সংশ্লিষ্ট মহল কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের পিছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে বলে মনে করছে। এক. অতীতের সব যুদ্ধেই পাকিস্তান প্রথমে আক্রমণ করেছে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে হওয়া যুদ্ধে পাক পদাতিক সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ এলাকার দখল নিয়েছিল। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানি সেনা ও জঙ্গিরা ভারতের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে। আর ১৯৭১-এর ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বায়ুসেনা লখনউ-সহ উত্তর ভারতের একাধিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালালে ভারতও পাল্টা যুদ্ধে জড়ায়। সেই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র পনেরো দিন। যদিও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনেক আগে থেকেই ভারতীয় সেনা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তা ছিল অঘোষিত সিদ্ধান্ত। যুদ্ধ করার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজও করে ভারতীয় সেনা।
৩ ডিসেম্বর সরকারিভাবে ভারত যুদ্ধে জড়ানোর আগেই পূর্ব পাকিস্তানের এক কোটি শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ, অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরায় আশ্রয় নেন। পাকিস্তান বিমান হামলা করে যুদ্ধ ঘোষণা করায় নাগরিকদের পরিস্থিতি মোবাবিলায় প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। আকাশবাণী থেকে দফায় দফায় ঘোষণা করা হত বিমান হানা হলে কীভাবে নিজেদের রক্ষা করতে হবে। সেবার ব্যারাকপুরে ভারতীয় বায়ুসেনার ঘাঁটিতে বোমা ফেলতে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে পাকিস্তানের একটি যুদ্ধ বিমান। ভারতীয় বায়ুসেনা বোমা নিক্ষেপের আগেই সেটিতে আঘাত হানে।
১৯৯৯-এর কারগিল সংঘাতের সময় যুদ্ধ মূলত হয়েছিল কাশ্মীরের কারগিল, দ্রাস সেক্টরে। ফলে গোটা দেশে সতর্কতা জারির প্রয়োজন হয়নি। এবার পাকিস্তান যদি ’৭১-এর মতো বিমান হানা শুরু করে তাহলে নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষার কথা বিবেচনায় রেখে মহড়ার নির্দেশিকা জারি হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
কারও কারও অভিমত, নরেন্দ্র মোদী সরকার তাদের আগেকার সিদ্ধান্তই এবার কার্যকর করার পথে হাঁটছে। গত বছর অক্টোবরে হরিয়ানায় অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের চিন্তন শিবিরের ভাষণে রাজ্যগুলির প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী মোদী গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ভবন ইত্যাদিকে যুদ্ধকালীন সময়ের জন্য সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই পরামর্শের উল্লেখ করে ২ মে রাজ্যগুলিকে চিঠি পাঠায় দিল্লি। সোমবারের চিঠিতে স্পর্শকাতর এলাকা, ভবনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও প্রস্তুত রাখতে মহড়ার আয়োজন করতে বলা হয়েছে। বিজেপির একটি মহলের দাবি, তাদের দল ও সরকার মনে করে দেশ রক্ষা শুধু সেনার কাজ নয়। নাগরিকেরা নিজেদের রক্ষা করে পরোক্ষে যুদ্ধে সহযোগিতা করতে পারেন।