ভারতে এর আগে কোন প্রকল্পে এত বিপুল সংখ্যায় সরকারি আধিকারিক এবং ঠিকাদারের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা দায়েরের নজির নেই। তাদের বিরুদ্ধে জলপ্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে।

শেষ আপডেট: 10 November 2025 11:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহে ভারত সরকারের মেগা প্রকল্প জল জীবন মিশনে নানা অনিয়ম আগেই ধরা পড়েছিল। তদন্ত শেষে ১৬টি রাজ্যের মোট ৫৯৬ জন ইঞ্জিনিয়ার ও আধিকারিক এবং ৮২২ ঠিকাদার সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক। সব মিলিয়ে ১৬ হাজারের বেশি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
ভারতে এর আগে কোন প্রকল্পে এত বিপুল সংখ্যায় সরকারি আধিকারিক এবং ঠিকাদারের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা দায়েরের নজির নেই। তাদের বিরুদ্ধে জলপ্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে। গত বছর ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় সরকারের জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক এই বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে অফিসার ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ হল যে ১৬ রাজ্যে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে সেগুলির সিংহভাগই বিজেপি শাসিত রাজ্য।
তালিকায় উপরের দিকে নাম রয়েছে বিহারের। ওই রাজ্যে গত কুড়ি বছর জনতা দল ইউনাইটেড এবং বিজেপির জোট সরকার ক্ষমতায়। রাজ্যের চলতি বিধানসভা নির্বাচনে জল প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়টি বিরোধীরা হাতিয়ার করেছে। বিহারে তদন্তে দেখা গিয়েছে সরকারি তালিকায় যে পরিবারগুলিতে জলের লাইন দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়, বাস্তবে সেখানে কেউ বাস করেন না। এমনকী বাড়ি ঘরেরও অস্তিত্ব মেলেনি। বিহারের নীতীশ কুমারের জমানায় এই দুর্নীতিকে অনেকেই লালু প্রসাদের শাসনে পশু খাদ্য কেলেঙ্কারি সঙ্গে তুলনা করছে। কেলেঙ্কারিতে দেখা গিয়েছিল যে সমস্ত ট্রাক-লরিতে করে গরু ছাগলের খাবার সরকারি খামারে সরবরাহ করা হয়েছে বলে নথিপত্রে উল্লেখ ছিল সেগুলি আসলে মোটর সাইকেল ভ্যান গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর। অস্তিত্বহীন পশু খামারে খাবার সরবরাহের ভুয়ো বিল জমা করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ছিল।
ওই ১৬ রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নামও আছে। তবে বাংলায় কোন ইঞ্জিনিয়ার বা আধিকারিক অভিযুক্ত নন। মামলা দায়ের হয়েছে দেড় শতাধিক ঠিকাদারের বিরুদ্ধে।
দেশে প্রতিটি পরিবারে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দিতে নরেন্দ্র মোদি সরকার 'হর ঘর জল' স্কিম চালু করে বছর দশেক আগে। চলতি বছরে সেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও লক্ষ্যমাত্রার ধারে কাছে পৌঁছতে পারেনি বেশিরভাগ রাজ্য। সেই কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২৮ সাল করা হয়েছে। জল সরবরাহ মন্ত্রকের আরজি মেনে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ করেছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। সেই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রকের একটি পর্যবেক্ষণকে ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়ে
জলজীবন মিশন প্রকল্পে। অর্থ মন্ত্রক জানাঢ়, ওই প্রকল্পে বিপুল অর্থ নয় ছয় হয়েছে।
সরকারি সূত্রের খবর, দিল্লিতে এই বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের পর সব রাজ্যকে বলা হয়, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত মন্ত্রী, অফিসার, ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে গোয়েন্দা তদন্তের নির্দেশ দিতে হবে। মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে লোকায়ুক্তকে তদন্তের ভার দেওয়া যেতে পারে, বলা হয়েছে কেন্দ্রের নির্দেশিকায়।
এই নির্দেশ জারির আগে সব রাজ্যে নজরদার নিয়োগ করেছিল কেন্দ্র। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে গোয়েন্দা তদন্তের নির্দেশ জারি হয়। কেন্দ্রীয় সরকার মনে করছে এটি একটি মেগা দুর্নীতির ঘটনা। বেশিরভাগ রাজ্য থেকেই এই প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ নয়ছয়ের অভিযোগ এসেছে। দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে বেশকিছু রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা সমস্যা দেখা দেয়। তার মধ্যে অন্যতম হল ভোটমুখী বিহার। ওই রাজ্যে জলজীবন মিশনে পানীয় জলের লাইন পেয়েছে বলে সরকারি রিপোর্টে যে পরিবার গুলির নাম উল্লেখ আছে দেখা গিয়েছে তারা ওই সুবিধা পায়নি। গত মাসে মণিপুরে এই প্রকল্পের অনিয়মের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অশান্তি হয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে।
অনিয়মের অন্যতম দিক হল প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। অর্থ ও ব্যয় বিষয়ক সচিবের কাছ থেকে এই সংক্রান্ত ‘নোট’ বা সুত্র পাওয়ার পর একাধিক রাজ্যে ‘নজরদার’ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রের জলশক্তি মন্ত্রক।
দেশের ১৩৫টি জেলায় ১৩৮ প্রকল্প খতিয়ে দেখেন মন্ত্রকের ৯৯জন নোডাল অফিসার। ওই ১৩৫ জেলা মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, ওড়িশা, তামিলনাড়ু, কেরল এবং কর্নাটকের। এ ছাড়া আছে ত্রিপুরা এবং উত্তরাখণ্ডের নাম।
পশ্চিমবঙ্গে একশো দিনের কাজ এবং আবাস যোজনায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও জল জীবন মিশনে অনিয়মে কেন্দ্রের তালিকায় গোড়ায় বাংলার নাম ছিল না। এই প্রকল্পে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল বিহারে। বিজেপি সমর্থিত নীতীশ কুমারের সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে বহু প্রকল্পের বাস্তবে কোনও অস্তিত্ব নেই। খাতায়কলমে সীমাবদ্ধ স্কিম। বিহারের অনিয়ম নিয়ে আগেই তদন্ত শুরু করে কেন্দ্র।
জল জীবন মিশন নরেন্দ্র মোদী সরকারের বহু প্রচারিত প্রকল্পগুলির একটি। ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সব ঘরে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। চলতি বছরের গোড়ায় কেন্দ্রের ব্যয় বিষয়ক সচিব এই প্রকল্পের বরাদ্দ ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেন। যুক্তি হিসাবে বলা হয় বহু জায়গায় অতিরিক্তি খরচ দেখানো হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয় মঞ্জুর করা হবে না। একই মন্তব্য করে নোট দেয় অর্থমন্ত্রকও। তার ভিত্তিতে ক্যাবিনেট সচিব জলশক্তি মন্ত্রকের অফিসারদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, রাজ্যগুলিতে টিম পাঠিয়ে প্রকল্পের ব্যয় এবং আনুষঙ্গিক বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। রাজ্যগুলির প্রথম তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের নাম ছিল না। কেন্দ্রের সদ্য পাঠানো নির্দেশিকায় বাংলার নাম আছে কিনা তা এখনও জানা যায়নি। তবে সরকারই সূত্রে বলা হচ্ছে, জলশক্তি মন্ত্রক সব রাজ্যকেই এই প্রকল্প নিয়ে সতর্ক করেছে এবং অনিয়মে যুক্ত সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তদন্ত শুরু নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু একটি কেন্দ্রীয় প্রকল্প তাই নির্দিষ্ট করে সিবিআই তদন্তে অগ্রাধিকার দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক। সিবিআই ছাড়াও লোকায়ুক্ত এবং পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করে।