মাদ্ভী হিডমার যুগের অবসান। বইপোকা থেকে শুরু করে শৃঙ্খলাবদ্ধ মাওবাদী কমান্ডার হিসেবে উঠে আসা হিডমা এনকাউন্টারে খতম। অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের গ্রেহাউন্ডস বাহিনীর অভিযানে মৃত্যু হল তাঁর স্ত্রীরও। বস্তার জঙ্গলে কীভাবে গড়ে উঠেছিল তাঁর দাপট?

মাদ্ভী হিডমা
শেষ আপডেট: 18 November 2025 16:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বছরের পর বছর গা ঢাকা দিয়ে ছিলেন মাদ্ভী হিডমা। এ দেশের নিরাপত্তা বাহিনী যত বার তাঁকে ধরার চেষ্টা করেছে, তত বারই ফসকে গিয়েছেন। কোনও সাম্প্রতিক ছবি নেই, নেই নির্ভরযোগ্য তথ্য, ফলে তল্লাশি চালিয়েও নাগাল পাওয়া যাচ্ছিল না এই কুখ্যাত মাওবাদী নেতার। প্রতিটি বিপদের আভাস পাওয়ার মতো শক্তিশালী ইনফর্মেশন নেটওয়ার্ক এবং কঠোর নিরাপত্তা বলয়, এই দুয়ের জোরে এত দিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
কিন্তু শেষরক্ষা হল না। কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাতার অভিযানে বহু মাওবাদী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। দুর্বল হয়ে পড়া সংগঠনকে আঁকড়ে ধরেন হিডমা এবং তাঁর সঙ্গে থাকা পাঁচ মাওবাদী। এ দিন সকালে অন্ধ্রপ্রদেশ–ছত্তীসগড়–তেলঙ্গানার ত্রিজংশনের কাছে এক জঙ্গলে গুলির লড়াইয়ে মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন হিডমার স্ত্রী রাজেও। অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের বিশেষ বাহিনী ‘গ্রেহাউন্ডস’ এই অপারেশন চালায় আজ।
বিদ্রোহীর জন্ম
মাদ্ভী হিডমা- ডেভা বা হিডমালু নামেও পরিচিত। ১৯৮১ সালে জন্ম পভর্তিতে, বর্তমান ছত্তীসগড়ের সুকমা জেলায়। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পরই মাওবাদী দলে যোগ দেন। অনেকের মতে, ছোটবেলায় নিজের গ্রামে মাওবাদীরা যখন একটি পুকুর তৈরি করছিল, সে ঘটনাই তাঁকে বিদ্রোহী দলে টেনে আনে। বস্তার, সুকমা দীর্ঘদিন উন্নয়নহীন ছিল; সেই সুযোগেই গত শতকের গোড়ার দিকে মাওবাদী সংগঠন সেখানে শক্ত ঘাঁটি বানায়।
হিডমার প্রথম দিককার পথপ্রদর্শক বলে পরিচিত আত্মসমর্পণ করা মাওবাদী রমেশ পুড়িয়ামি ওরফে বড়ান্না মনে করেন, সে সময়ের এক উদ্যমী যুবক হিসেবেই তিনি হিডমাকে চিনেছিলেন। হিডমা নিজেই জানিয়েছিলেন, তিনি মাওবাদীদের দলে যোগ দিতে চান। উৎসাহ দেখে বড়ান্না দলে নেন। দু’বছর তাঁর সঙ্গে থেকে কাজ করার পর হিডমার হাতে একটি প্লাটুনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়।
এর পর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মির একটি ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব পান। সিপিআই (মাওবাদী)-র শীর্ষ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী সংস্থা কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হন হিডমা। বস্তার এলাকার একমাত্র উপজাতি সদস্য হিসেবেও তাঁর গুরুত্ব ছিল আলাদা। দণ্ডকারণ্য স্পেশাল জোনাল কমিটিতেও ছিল প্রভাবশালী ভূমিকা।
স্থানীয় জনসমর্থন ও যোগসূত্র সুবিধা করে দিয়েছিল তাঁকে অনেকটা। কিন্তু যাঁরা কাছ থেকে চেনেন, তাঁদের মতে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল শৃঙ্খলা। আত্মসমর্পণ করা মাওবাদী এবং বর্তমানে অ্যান্টি-রেবেল বাহিনী জেলা রিজার্ভ গার্ডে কর্মরত সুন্দরি জানিয়েছেন, ভোর চারটেয় উঠে প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়ে দিনের পরিস্থিতি বুঝতেন হিডমা। ছিলেন বইপোকা। নিজের ব্যাটালিয়নকে শারীরিক প্রশিক্ষণে ঠেলে দেওয়ার ব্যাপারে ছিলেন নির্মম। বনে-জঙ্গলে টিকে থাকার লড়াইয়ে শারীরিক ফিটনেসকেই প্রধান অস্ত্র বলেই মনে করতেন। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন বলে সম্মান পেতেন সঙ্গীদের।
আসক্তি কোনও কিছুর প্রতি ছিল না। তবে গরুর মাংস, মুরগি এবং চা খেতে ভালবাসতেন। ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন, তাই রুটি ছাড়া খেতেন না কিছু।
ছকভাঙা ছক কষতেন
হিডমার নেতৃত্বাধীন ব্যাটালিয়নকে মাওবাদীদের সবচেয়ে প্রাণঘাতী স্ট্রাইক ইউনিট হিসেবে ধরা হয়। তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকা অন্তত ২৬টি বড়সড় হামলার মধ্যে আছে ২০১০ সালের দান্তেওয়াড়া হত্যাকাণ্ড, যেখানে ৭৬ জন প্যারামিলিটারি জওয়ান নিহত হন এবং ২০১৩ সালের ঝিরম ঘাঁটি হামলা, যেখানে ছত্তীসগড় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা-সহ ২৭ জন প্রাণ হারান।
২০২১ সালের সুকমা–বিজাপুরে ২২ নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যু যে হামলায় ঘটে, সেটির মূল ছক তিনি সাজিয়েছিলেন বলে অনুমান।
জঙ্গলযুদ্ধের কায়দায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন হিডমা। নিজের চারপাশে এমন শক্ত নিরাপত্তা বলয় রাখতেন যে রাজ্য পুলিশের ডিজির নিরাপত্তার চেয়েও বেশি আঁটসাঁট, বলছেন ওই আধিকারিক। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সাজানো কমান্ডোরা তাঁর সঙ্গ দিত। গ্রামে যাতায়াত কম করতেন, কিন্তু সেখানকার ইনফর্মাররা তাঁকে নিরাপত্তা বাহিনীর গতিবিধি নিয়মিত জানাত। এহেন নেতার মাথায় ছিল ৫০ লক্ষ টাকা।
পরিণতি এবং তাৎপর্য
অন্ধ্রপ্রদেশের আল্লুরি সীতারামারাজু জেলার মারেদুমিল্লি জঙ্গলে এ দিন সকালে তুমুল গুলিযুদ্ধ শুরু হয়। গ্রেহাউন্ডস বাহিনী সেই অভিযানে হিডমা-সহ ছ’জন মাওবাদীকে খতম করে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন হিডমার স্ত্রী রাজেও।
অন্ধ্রপ্রদেশের ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশ হরিশ কুমার গুপ্ত জানিয়েছেন, এ অপারেশন দেশের অ্যান্টি-মাওবাদী অভিযানে ‘মাইলস্টোন’। তাঁর কথায়, “হিডমার মৃত্যু মাওবাদী-বিরোধী লড়াইয়ে বড় মোড় ঘোরাল। সিপিআই (মাওবাদী)-র সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ইউনিটের মাথাটাই কেটে দেওয়া হল।” তিনি এ-ও জানান, হিডমা অতি-দরিদ্র আদিবাসী যুবকদের দলভুক্ত করার অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন।
এমন এক সময়েই এই বড় ধাক্কাটা খেল মাওবাদীরা, যখন কেন্দ্রের লাগাতার অভিযানে ও আত্মসমর্পণের ঢলে সংগঠন দিশেহারা। হিডমার মৃত্যু সংগঠনটিকে আরও দুর্বল করে দেবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা মহল। সরকারের ‘রেড টেরর’-মুক্তির প্রচেষ্টায় এ ঘটনা নিঃসন্দেহে সাহায্য করবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।