রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর জন্মস্থান রায়রংপুরে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন চলছে। নতুন রেললাইন, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, আয়ুষ হাসপাতাল, গবেষণা কেন্দ্র থেকে শিল্পপার্ক— মুর্মুর প্রভাবেই বদলে যাচ্ছে ওড়িশার এই জনপদ।

রাষ্ট্রপতি মুর্মুর জন্মভূমি রায়রংপুর।
শেষ আপডেট: 3 October 2025 13:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২২ সালের জুলাই মাসে হঠাৎই আলোচনায় উঠে এসেছিল ওড়িশার মায়ুরভঞ্জ জেলার ছোট্ট শহর রায়রংপুর। কারণ সেখানকারই ভূমিকন্যা দ্রৌপদী মুর্মু দেশের ১৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাই, কার্যত রাতারাতিই সারা দেশ চিনে ফেলে একসময় ধুলোকাদায় ভরা, অচল রাস্তাঘাট, ভগ্নপ্রায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর অপ্রতুল অবকাঠামোর জন্য 'কুখ্যাত' জনপদ রায়রংপুরকে।
কিন্তু মুর্মুর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করেছে শহরের চেহারা। এখন ইস্পাত আর কংক্রিটের নতুন স্থাপত্য গড়ে উঠছে রায়রংপুরে। এ বছরের জুলাই মাসেই এটিকে আলাদা পুলিশ জেলা বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন একটি আয়ুর্বেদ কলেজ ও একটি বহুমুখী আয়ুষ হাসপাতাল (আয়ুর্বেদ, যোগ, ন্যাচারোপ্যাথি, ইউনানি, সিদ্ধা ও হোমিওপ্যাথি) তৈরি হচ্ছে। একটি আদিবাসী গবেষণা কেন্দ্রও গড়ে উঠছে। প্রায় ৪৩ কোটি টাকার স্পোর্টস কমপ্লেক্স, সঙ্গে সিনথেটিক ট্র্যাক নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত এয়ারস্ট্রিপকেও আঞ্চলিক বিমান উন্নয়ন কর্মসূচি ‘উড়ান’-এর অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তাভাবনা চলছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, খুব শিগগিরই রায়রংপুরকে আলাদা জেলা ঘোষণাও করা হতে পারে।
শুধু তাই নয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রপতি মুর্মু তিনটি নতুন রেললাইনের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন— বাঙ্গিরিপোসি–গোরুমহিসানি (৮৫.৬ কিমি, ₹২,৫৪৯ কোটি), বুরমারা–চাকুলিয়া (৬০ কিমি, ₹১,৬৩৯ কোটি), বাদামপাহাড়–কেন্ডুজগড় (৮২ কিমি, ₹২,১০৬ কোটি)।
এই প্রকল্পগুলি উত্তর ওড়িশার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা। মায়ুরভঞ্জ খনিজসমৃদ্ধ জেলা হলেও এতদিন যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব ছিল। নতুন লাইন চালু হলে খনিজ পরিবহণ দ্রুততর হবে, ভ্রমণের সময় কমবে এবং রায়রংপুর ঝাড়খণ্ড ও উপকূল ওড়িশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। স্থানীয় রেলস্টেশনও আধুনিক সুবিধাসহ উন্নীত হচ্ছে।
বুরমারা–চাকুলিয়া রেললাইন ঝাড়খণ্ডের শিল্পকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগ দেবে।
বাদামপাহাড়–কেন্ডুজগড় লাইন খনিজভিত্তিক শিল্প ও সিমলিপাল ন্যাশনাল পার্কে পর্যটন বাড়াবে।
মুর্মুর প্রতিষ্ঠিত এসএলএস ট্রাস্ট-এর এলঅ্যান্ডটি স্কিল হাবে আদিবাসী ছেলে-মেয়েরা রাজমিস্ত্রি, ওয়েল্ডিং, সৌরপ্যানেল ইনস্টলেশনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
ওড়িশায় অনুমোদিত ১০০টি একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩টি মায়ুরভঞ্জে তৈরি হচ্ছে।
একটি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপার্কও পরিকল্পনায় রয়েছে।
মুর্মুর জীবনীকার সন্দীপ সাহু বলছেন, এই অঞ্চলের উন্নয়ন শুরু হয়েছিল, দ্রৌপদী মুর্মু বিধায়ক ও মন্ত্রী থাকার সময় থেকেই। তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর গতি বেড়েছে বহুগুণে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২২ সালে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছিল। এটাই ছিল 'মুর্মু প্রভাব'-এর প্রথম ঝলক। তবে তিনি এটাও যোগ করেন, প্রতিশ্রুত সব প্রকল্প তাঁর মেয়াদের মধ্যেই বাস্তবায়িত হবে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
রায়রংপুরের পরিবর্তনকে অনেকেই তুলনা করছেন হিঞ্জিলির সঙ্গে। একসময় অভিবাসনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হিঞ্জিলি বদলে গিয়েছিল ২০০০ সালে, যখন পাঁচবারের মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক সেখান থেকে ভোট লড়া শুরু করেন। আজ সেখানে প্রতিটি ঘরে পরিশুদ্ধ জল, সৌরবিদ্যুৎ চালিত রাস্তার আলো, ১০০ বেডের চোখের হাসপাতাল রয়েছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, যিনি ২০২৪-এ সাংবালপুর থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, সেই অঞ্চলকেও 'জ্ঞান ও শিল্পকেন্দ্র' হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন। বুর্লার বীর সুরেন্দ্র সাই মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটের সম্প্রসারণ, সুপার স্পেশালিটি উইং, ক্যানসার কেয়ার সেন্টার—এসব প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। রাজ্য সরকারও সেখানে ২৪০ কোটি টাকার মহানদী রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট, ৩৮২ কোটি টাকার ২৪ ঘণ্টার পানীয়জল প্রকল্প, এবং একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, রায়রংপুরের এই দ্রুত পরিবর্তন যেন নিছকই এক উন্নয়ন প্রকল্পের খতিয়ান নয়, বরং এক প্রতীকী যাত্রায এক সময়ের অবহেলিত জনপদ আজ রাষ্ট্রপতির জন্মভূমি হয়ে নতুন মর্যাদা ও স্বপ্নের আলোয় ভাসছে। রেললাইন থেকে হাসপাতাল, স্কুল থেকে শিল্পকেন্দ্র— সবকিছু মিলিয়ে শহরটি যেন নতুন ইতিহাস লিখতে শুরু করেছে। তবে মানুষের প্রত্যাশা একটাই। এইসব প্রতিশ্রুত অগ্রগতি যেন কাগজে-কলমে আটকে না থাকে, বাস্তবেও যেন গড়ে ওঠে এক আধুনিক ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন রায়রংপুর।