ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে (Narendra Modi) ‘মহান নেতা’ ও ‘বন্ধু’ বলে প্রশংসা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, (Donald Trump) রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধের আশ্বাসে সন্তুষ্ট।

ট্রাম্প ও মোদী।
শেষ আপডেট: 16 October 2025 13:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার ওয়াশিংটন থেকে এমনই খবর মিলেছে। জানা গেছে, মোদীকে তিনি 'মহান নেতা' ও নিজের 'বন্ধু' বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে রাজনীতি-বোদ্ধারা অনেকেই দাবি করছেন, নিছক এই প্রশংসার আড়ালে কড়া হুঁশিয়ারিও আছে। কারণ ট্রাম্প হেসে বলেছেন, 'আমি মোদীর রাজনৈতিক কেরিয়ার খতম করতে চাই না।'
এই কথাতেই স্পষ্ট, ভারত যদি তেল কেনা নিয়ে রাশিয়ার দিকেই ঝুঁকে থাকে, বা আমেরিকার কথা না শোনে, তাহলে ট্রাম্পও মোটেও হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না। এমন কোনও বড় পদক্ষেপই করবেন, যা মোদীকে বিপদে ফেলে তথা ভারতের রাজনীতিকেও প্রভাবিত করে!
জানা গেছে, এদিন একই সঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভারত তাঁকে আশ্বাস দিয়েছে— তারা রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, 'মোদী একজন মহান মানুষ। উনি আমাকে ভালবাসেন।' এরপরই হেসে যোগ করেন, কেরিয়ার নষ্ট করতে না চাওয়ার কথাটা।
ট্রাম্পের কথায়, 'আমি বহু বছর ধরে ভারতকে দেখছি। অসাধারণ দেশ। এক সময় প্রতি বছর একজন নতুন নেতা পেত ভারত, কিন্তু এখন আমার বন্ধু অনেক দিন ধরেই আছেন।'
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানান, মোদী তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ভারত আর রাশিয়া থেকে তেল কিনবে না। তিনি বলেন, 'উনি নিশ্চিত করেছেন যে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা হবে না। এটা একেবারে সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা যায় না, কিন্তু প্রক্রিয়াটা দ্রুত শেষ হবে।'
ট্রাম্পের মতে, এই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে। তাঁর ভাষায়, 'এটা একটা বড় পদক্ষেপ। রাশিয়াকে চাপে ফেলতে এটা প্রয়োজন।'
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, ভারতের জ্বালানি নীতির মূল লক্ষ্য সব সময়ই ভারতীয়দের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা, কোনও বিদেশি চাপ নয়।
বুধবার এক বিবৃতিতে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জায়সবাল বলেন, 'ভারত একটি বড় তেল ও গ্যাস আমদানিকারী দেশ। অস্থির পরিস্থিতিতে ভারতীয় উপভোক্তার স্বার্থ রক্ষাই আমাদের নিরবচ্ছিন্ন অগ্রাধিকার। আমাদের আমদানি নীতির লক্ষ্যই এটা।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'স্থিতিশীল দামের নিশ্চয়তা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, এই দুই লক্ষ্যই আমাদের জ্বালানি নীতির ভিত্তি। সেই কারণে আমরা সবসময় জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে চাই, বাজারের অবস্থার উপর নির্ভর করে।'
পাশাপাশি তাঁর এও বক্তব্য, 'আমেরিকার ক্ষেত্রেও গত এক দশকে আমরা ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধি করেছি। বর্তমান প্রশাসনও ভারতের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা গভীর করার ইচ্ছা দেখিয়েছে। আলোচনা চলছে।'
বুধবার ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, 'যখন ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কিনছিল, আমরা তাতে বেশ বিরক্ত হয়েছিলাম। কারণ এতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন তাঁর যুদ্ধে সরাসরি অর্থ সাহায্য পাচ্ছিল।'
তিনি বলেন, 'মোদী আমার বন্ধু, আমাদের সম্পর্ক ভাল, কিন্তু উনি রাশিয়া থেকে তেল কিনছেন— সেটা আমাদের পছন্দ হয়নি। কারণ এতে রাশিয়া-ইউক্রেনের এই হাস্যকর যুদ্ধ আরও বেড়েছে, যেখানে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ মারা গেছেন।'
মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি, আমেরিকার উদ্দেশ্য একটাই— প্রেসিডেন্ট পুতিনকে চাপ দেওয়া যেন তিনি যুদ্ধ থামান। তিনি বলেন, 'আমরা চাই পুতিন ইউক্রেনীয় ও রাশিয়ান, দু'পক্ষেরই হত্যা বন্ধ করুন। এটা এমন এক যুদ্ধ যা এক সপ্তাহে শেষ হতে পারত, প্রায় চার বছর ধরে চলছে।'
তিনি আরও জানান, ভারতের প্রতিশ্রুতির পর তিনি আশাবাদী, খুব শিগগিরই ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে। তাঁর কথায়, 'যখন যুদ্ধ শেষ হবে, তখন ওরা আবার বাণিজ্য শুরু করতে পারবে।'
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ইউরোপীয় চাহিদা কমে যাওয়ায় রাশিয়া তেল বিক্রিতে বড় ছাড় দিতে শুরু করে। সেই সময় ভারত, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে, রাশিয়া থেকে আমদানি বাড়িয়ে দেয়।
আগে যেখানে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি ছিল মোটের ১ শতাংশেরও কম, তা এখন প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে এই নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়। ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের রাশিয়া থেকে তেল কেনাকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশে তোলে। রাশিয়ার তেল কেনার জন্য অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কও আরোপ করা হয়।
ভারত সেই পদক্ষেপকে 'অন্যায্য, অযৌক্তিক ও অনৈতিক' বলেও বর্ণনা করেছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যতদিন চলবে, ততদিন ভারতের জন্য এই ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হবে। একদিকে সস্তা জ্বালানির প্রয়োজন, অন্যদিকে মার্কিন কূটনৈতিক চাপ, এর মাঝে ভারত কী করে, সেটাই এখন দেখার।