দিল্লির বাতাসে বিষ— ক্লাউড সিডিং ব্যর্থ, AQI পৌঁছল ৩৫২-এ। বিবেক বিহার, আনন্দ বিহারে ‘সিভিয়ার’ দূষণ, বিশেষজ্ঞরা বলছেন আর্দ্রতার অভাবেই বিপর্যয়। কলকাতার অবস্থাও বেহাল।

বাড়ছে দূষণ। ছবি: এআই
শেষ আপডেট: 30 October 2025 13:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিল্লি আবারও দূষণের (Delhi Pollution) ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ঘুম ভাঙল ঘন ধোঁয়াশার মধ্যে। রাতারাতি বাতাসের মান ভয়ঙ্করভাবে খারাপ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যে কৃত্রিম বৃষ্টির আশা করা হয়েছিল— তা গেল ‘ধোঁয়ায়’। আইআইটি কানপুরের সহযোগিতায় দিল্লি সরকার যে ক্লাউড সিডিং বা মেঘে রাসায়নিক প্রয়োগ করে বৃষ্টি ঘটানোর পরীক্ষা চালায়, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ (CPCB)-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিল্লির সার্বিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ছিল ৩৫২, যা ‘খুবই খারাপ’ বা Very Poor শ্রেণির মধ্যে পড়ে। মঙ্গলবারের তুলনায় এটি ৮০ পয়েন্ট বেশি।
শুধু রাজধানী নয়, নয়ডা, গাজিয়াবাদ ও গুরগাঁওয়ের মতো শহরগুলিও ‘ভেরি পুওর’ ক্যাটেগরিতে নেমে এসেছে। আবহাওয়া দফতর অবশ্য জানিয়েছে, নোয়ডা, দাদরি, গ্রেটার নয়ডা, ফরিদাবাদ ও হরিয়ানার কিছু অংশে হালকা বৃষ্টি হতে পারে দিনের শেষে। কিন্তু সেই আশ্বাসে স্বস্তি পাচ্ছেন না কেউ।
দিল্লির ৩৮টি মনিটরিং স্টেশনের মধ্যে ৩২টিতেই বাতাসের মান ছিল ‘খুবই খারাপ’। কিছু এলাকায় পরিস্থিতি ‘সিভিয়ার’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সবচেয়ে দূষিত এলাকা হিসেবে উঠে এসেছে বিবেক বিহার (AQI ৪১৫) ও আনন্দ বিহার (AQI ৪০৯)— দুটোই ‘সিভিয়ার’ স্তরে। ওয়াজিরপুরে AQI ছিল ৩৯৪, যা প্রায় একইভাবে ভয়াবহ।
AQI স্কেলে ০–৫০ ‘ভাল’, ৫১–১০০ ‘সন্তোষজনক’, ১০১–২০০ ‘মধ্যম’, ২০১–৩০০ ‘খারাপ’, ৩০১–৪০০ ‘খুব খারাপ’ এবং ৪০১–৫০০ ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ হিসেবে ধরা হয়।
দিল্লির মতোই ধোঁয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে কলকাতাও। বাতাসে বিষ, আকাশে ধোঁয়ার পরত। দূষণ মাপার সূচকে দিল্লির পিছু পিছু তিলোত্তমাও এখন ভয়াবহ সংকেতের দিকে এগোচ্ছে। আবহাওয়া দফতর সূত্রের খবর, দীপাবলির পর থেকেই শহরজুড়ে ঝুলছে এক অদ্ভুত ধোঁয়া। বাতাসে ঘন ধূলিকণা, অনেকেরই গলায় কাঁটা ভাব, চোখে জ্বালা।
সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের (CPCB) তথ্য অনুযায়ী, আজ, বৃহস্পতিবার কলকাতার গড় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ৩৪৮ ছুঁয়েছে — যা সরাসরি “Very Poor” শ্রেণিতে পড়ে। মঙ্গলবারের তুলনায় বেড়েছে প্রায় ৮০ পয়েন্ট।
শহরের বেশিরভাগ মনিটরিং স্টেশনই লাল সংকেতে। বালিগঞ্জ, যাদবপুর, বিধাননগর ও ভিক্টোরিয়া অঞ্চলে AQI ৪০০ ছুঁয়েছে— অর্থাৎ “Severe”। পিএম ২.৫ কণার পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত উঠেছে, যা নিরাপদ সীমার ২০ গুণ।
পরিবেশবিদদের মতে, কলকাতার এই বাড়তি দূষণের জন্য দায়ী তিনটি প্রধান কারণ— গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, খোলা নির্মাণক্ষেত্রের ধুলো এবং উৎসব মরশুমে বাজির অতিব্যবহার।
পরিবেশ কর্মী সুভাষ দত্তের কথায়, “আমরা নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়ছি। উন্নয়নের নামে শহরটাকে গ্যাস চেম্বারে পরিণত করছি।” তাঁর মতে, শহরের যে অংশে জনঘনত্ব বেশি, সেখানেই দূষণ সবচেয়ে মারাত্মক।
IQAir-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় কলকাতার অবস্থান অষ্টম। দিল্লি শীর্ষে, এরপর মুম্বই পঞ্চম স্থানে। অর্থাৎ, বাতাসের গুণমানে ভারতের দুই সাংস্কৃতিক রাজধানীই আজ বিষাক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে দিনে কলকাতার বায়ুমণ্ডলে PM2.5 এবং PM10-এর পরিমাণ বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক, শহরের বাসিন্দারা বিষয়টি নিয়ে উদাসীন। সকালবেলার হাঁটায় যারা বেরোন, তারা জানেন না, প্রতিদিনের সেই ‘হেলদি’ রুটিনই আসলে ধোঁয়াজনিত বিষ গ্রহণের আরেক উপায়।
কলকাতা পুরসভা ইতিমধ্যেই দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিয়েছে। গত সপ্তাহ থেকেই প্রতিদিন সকাল-বিকেল ও রাতে চলেছে জলের স্প্রে ও রোড ওয়াশিং। ২০টি ওয়াটার স্প্রিংকলার ও দুটি মিস্ট ক্যানন শহরজুড়ে ঘুরছে। পাশাপাশি চলছে রাস্তার ধুলোমোছা এবং গাছ ধোওয়ার কাজ।
পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্র বলেন, “কলকাতার বাতাসের মান এখনও তুলনামূলক ভালো, কিন্তু ঢিল দিলে সেই জায়গা থেকেও নামতে সময় লাগবে না। সচেতনতা এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষণ রোধে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, দরকার সমাধানমুখী উদ্যোগ। সুভাষ দত্ত জানান, “রাস্তার ধারে বড় পাতা, কম পাতা ঝরানো গাছ যেমন বট, অশ্বত্থ, আমলকি বা বকুল লাগানো দরকার। এরা বেশি কার্বন শোষণ করতে পারে, শীতে টিকে থাকে, বাতাস পরিশুদ্ধ করে।”
তিনি গত ২০ বছর ধরে শহরে গাছের ভাইফোঁটা দেন— প্রতীকী উদ্যোগে মনে করিয়ে দেন, প্রকৃতির সঙ্গেই আত্মীয়তা রাখাই টিকে থাকার একমাত্র পথ।
কারণ দিল্লির মতোই আজ কলকাতার বাতাসও বিপদসীমায়। পার্থক্য একটাই— এখানে এখনও একটু আশা আছে। কিন্তু সেই আশাকেও রক্ষা করতে হবে মানুষকেই। নয়তো ক্লাউড সিডিং ব্যর্থ হবে, স্প্রে ব্যর্থ হবে, সবুজও মুছে যাবে ধোঁয়ার ভেতর।
দিল্লি সরকারের সহযোগিতায় আইআইটি কানপুরের বিজ্ঞানীরা দুই দফায় ক্লাউড সিডিং ট্রায়াল চালান, যাতে মেঘে রাসায়নিক ছড়িয়ে কৃত্রিম বৃষ্টি ঘটিয়ে বাতাসের দূষণ ধুয়ে ফেলার চেষ্টা হয়। কিন্তু পরীক্ষার পর আকাশ থেকে এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়েনি।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল আর্দ্রতার অভাব। মঙ্গলবার পরীক্ষার সময় বাতাসে আর্দ্রতা ছিল মাত্র ১০–১৫ শতাংশ, যেখানে সফল ক্লাউড সিডিংয়ের জন্য ন্যূনতম ৫০–৬০ শতাংশ আর্দ্রতা প্রয়োজন।
দিল্লিতে প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে AQI ৩০০–৪০০-র মধ্যে ঘোরাফেরা করছে— যা গ্রহণযোগ্য সীমার প্রায় ২০ গুণ বেশি। ফলে আগেই GRAP-II পর্যায়ের জরুরি পদক্ষেপ চালু হয়েছে, যার মধ্যে নির্মাণকাজে নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য পোড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা ও ট্রাফিক সীমাবদ্ধতা অন্তর্ভুক্ত।
অতএব, ‘প্রযুক্তি দিয়ে বৃষ্টি নামানোর’ সেই স্বপ্নও এখন ধোঁয়ায় মিলিয়ে গেছে। দূষণ থাকল, আকাশে মেঘ থাকলেও সেখান থেকে মুক্তি এল না।