প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া যদিও ভারতে নির্দিষ্ট শর্তে বৈধ, তবুও বিষয়টি এখনও সংবেদনশীল। ধর্মীয়, নৈতিক এবং আইনি নানা বিতর্ক এই প্রশ্নকে ঘিরে রয়েছে। অবশ্য অরুণা শানবাগ থেকে হরিশ রানা—এই দীর্ঘ আইনি পথচলা দেখিয়ে দিয়েছে, ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ধীরে ধীরে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’ বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিকে এগিয়েছে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 13 March 2026 10:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘মৃত্যুর অধিকার’ (Euthanasia) —এই শব্দবন্ধটি একসময়ে ভারতীয় আইনে ছিল প্রায় অচিন্তনীয়। দেশের সংবিধান, আইনি ব্যবস্থা সেই অধিকার কাউকেই তখনও দেয়নি। অথচ কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে কদম তাল রেখে গত এক দশকে ক্রমশই বদলে গেল ধারণা। দেশের শীর্ষ আদালতও বুঝতে পারল, কৃত্রিম ভাবে বাঁচিয়ে রেখে একটি মানুষের যন্ত্রণা দীর্ঘায়িত করা অর্থহীন। অরুণা শানবাগ মামলার (Aruna Shanbaug - 2011) হাত ধরে ভারতে প্রথমবার আইনি স্বীকৃতি পায় প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া (Euthanasia)। সম্প্রতি হরিশ রানা (Harish Rana Supreme Court) মামলায় সেই আইনি নীতিই আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এল।
ঘটনা যন্ত্রণাদায়ক হলেও ঐতিহাসিক মুহূর্তও বটে। ভারতে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার আইন কীভাবে ধাপে ধাপে সাবালক হল, তার ইতিহাসটাও তাই এই অবসরে দেখে নেওয়া যেতে পারে।
অরুণা শানবাগ মামলা: আইনের প্রথম মোড় (২০১১)
ভারতে ইউথেনেশিয়া নিয়ে আইনি বিতর্ক শুরু হয় অরুণা শানবাগ মামলাকে ঘিরে। মুম্বইয়ের কেম হাসপাতালে কর্মরত এই নার্স ১৯৭৩ সালে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হন। সেই ঘটনার পর তিনি প্রায় ৪২ বছর কোমায় ছিলেন তিনি।
২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট ওই মামলার রায় দিতে গিয়ে প্রথমবার বলে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া অনুমোদন করা যেতে পারে। অর্থাৎ, রোগীর আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে আদালতের অনুমতি নিয়ে লাইফ সাপোর্ট তুলে নেওয়া যেতে পারে।
তবে আদালত কঠোর কিছু শর্তও বেঁধে দিয়েছিল—পরিবারের আবেদন, চিকিৎসকদের মতামত ও সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের অনুমতি ছিল বাধ্যতামূলক। সেই রায়ের মাধ্যমে ভারতে প্রথমবার ‘মৃত্যুর অধিকার’ নিয়ে আইনি কাঠামো তৈরি হয়।
লিভিং উইল স্বীকৃতি: আরও এক বড় পদক্ষেপ (২০১৮)
২০১৮ সালে ‘কমন কজ বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আরও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। আদালত জানায়, একজন ব্যক্তি আগেই লিখিতভাবে জানিয়ে রাখতে পারেন যে তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার চিকিৎসা চান না।
এই নথিকে বলা হয় ‘লিভিং উইল’। এই রায়ের মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট করে দেয়—‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’ (Right to Die with Dignity) সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অংশ।
হরিশ রানা মামলা: নতুন করে আলোচনায় প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া
সম্প্রতি হরিশ রানা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আবার এই প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভেজিটেটিভ (Persistent Vegetative state) অবস্থায় থাকা এক রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে আদালত প্রশ্ন তোলে।
এই মামলায় শীর্ষ আদালত জানায়, চিকিৎসকরা যদি নিশ্চিত হন যে রোগীর আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে পরিবার এবং চিকিৎসকদের মতামতের ভিত্তিতে লাইফ সাপোর্ট তুলে নেওয়া যেতে পারে। এই সিদ্ধান্ত আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, আইনের মূল লক্ষ্য শুধু জীবন দীর্ঘায়িত করা নয়, বরং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা।
তবে এখনও বিতর্ক রয়েছে। প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া যদিও ভারতে নির্দিষ্ট শর্তে বৈধ, তবুও বিষয়টি এখনও সংবেদনশীল। ধর্মীয়, নৈতিক এবং আইনি নানা বিতর্ক এই প্রশ্নকে ঘিরে রয়েছে। অবশ্য অরুণা শানবাগ থেকে হরিশ রানা—এই দীর্ঘ আইনি পথচলা দেখিয়ে দিয়েছে, ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ধীরে ধীরে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’ বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিকে এগিয়েছে।