নীতীশের নাম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণার বিষয়ে আর একটি ইস্যু বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে বিজেপিকে। পদ্ম শিবিরের বহু নেতা এখন মনে করছেন, নীতীশ কুমারকেই পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এখনই নাম ঘোষণা না করা হলে ফাটল ধরতে পারে মহিলা ভোট ব্যাঙ্ককেও।

শেষ আপডেট: 27 October 2025 14:03
'দিন চারেক আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, এনডিএ-র (NDA) পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন সেটা নির্বাচনের পর বিধায়করা মিলে ঠিক করবেন। নীতীশ কুমারই (Nitish Kumar) ফের মুখ্যমন্ত্রী হবেন কি না আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।' সেদিনই সমস্তিপুরের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, 'বিগত নির্বাচন গুলির মত এবারও বিহারে এনডিএ নীতীশজির নেতৃত্বে নির্বাচনে লড়াই করছে।' প্রধানমন্ত্রী এটুকু বলেই অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। সেই সভায় উপস্থিত জেডিইউ সমর্থকেরা আশা করেছিলেন নীতীশ কুমারকে ফের মুখ্যমন্ত্রী করার কথা ঘোষণা করবেন প্রধানমন্ত্রী।
শুধু মোদী শাহ'রাই নন, বিহারের বিধানসভা ভোটের ঘন্টা বাজার পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী তো নিয়ে সতর্ক বিজেপি এবং জেডিইউ বাদে এনডিএ'র বাকি শরিকরা। দুদিন আগে লোক জনশক্তি (রামবিলাস) পার্টির সুপ্রিমো চিরাগ পাসোয়ানও দাবি করেন, এনডিএ-র কোনও মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী নেই। নীতীশ কুমার এখন মুখ্যমন্ত্রী। সেই কারণে আমরা তাঁর নেতৃত্বে লড়াই করছি। কিন্তু রবিবার সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলেছেন বিহারের উপ মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা সম্রাট চৌধুরী। একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সম্রাট বলেছেন, নীতীশ কুমার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, আছেন, থাকবেন। আগামী পাঁচ বছর তিনি রাজ্য সরকারকে নেতৃত্ব দেবেন।

নীতীশ কুমার ও উপমুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা সম্রাট চৌধুরী
বিজেপি সূত্রের খবর, সম্রাট চৌধুরীকে দিয়ে নীতীশ কুমার সম্পর্কে বিজেপি নতুন বয়ান সামনে আনতে বাধ্য হয়েছে বিরোধী জোটের মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী তেজস্বী যাদবের লাগাতার প্রচারের কারণে। তেজস্বী প্রতিটি জনসভায় পালা করে বলছেন, বিহারে নীতীশ কুমার আর মুখ্যমন্ত্রী হবেন না। এনডিএ জিতে গেলে মুখ্যমন্ত্রী হবেন বিজেপির কোন নেতা। তেজস্বীর এই প্রচারের উদ্দেশ্য হলো মুসলিম এবং নিম্নবর্গের মানুষদের মধ্যে বিজেপিকে নিয়ে ভয় ধরানো। বিশেষ করে বিজেপি সরকার গড়লে মুসলিমদের পাশাপাশি দলিত ওবিসি এবং আদিবাসীরা বিপন্ন হবে বলে আরজেডি সহ ইন্ডি জোটের শরিকেরা জোরদার প্রচার চালাচ্ছে। বিজেপির ভোট ম্যানেজাররা মনে করছেন, তেজস্বী সহ বিরোধী নেতাদের এই প্রচারে এনডিএ বড় বিপদে পড়তে পারে। নীতীশ মুখ্যমন্ত্রী হবেন না এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেলে জনতা দল ইউনাইটেডের সঙ্গে থাকা অতি-পিছড়া বা ইবিসি ভোট ব্যাঙ্কে ফাটল ধরতে পারে। ওই সম্প্রদায়ের লোকেরা মহাগঠন্ধনকে ক্ষমতায় আনতে ভোট দিতে পারে।
নীতীশের নাম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণার বিষয়ে আর একটি ইস্যু বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে বিজেপিকে। পদ্ম শিবিরের বহু নেতা এখন মনে করছেন, নীতীশ কুমারকেই পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এখনই নাম ঘোষণা না করা হলে ফাটল ধরতে পারে মহিলা ভোট ব্যাঙ্ককেও। নরেন্দ্র মোদীর মতো নীতীশ ও মহিলা ভোটারদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। তিনি পঞ্চায়েত ও পুরসভায় মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ চালু করেছেন। এই দুই প্রতিষ্ঠানেরই আধিকারিকেরা ভাল টাকা ভাতা হিসেবে পান। ফলে নিচু তলায় নীতীশের নির্বাচনী সংগঠনের একটি বড় অস্ত্র হল পঞ্চায়েত ও পুরসভা। জাত, ধর্ম ও লিঙ্গভিত্তিক এই ভোটের রসায়ন বিবেচনায় রেখে বিজেপি নেতারা এখন বলতে শুরু করেছেন এনডিএ ক্ষমতায় এলে ফের নীতীশই হবেন মুখ্যমন্ত্রী।
নীতীশ কুমার গত আড়াই দশক বিজেপির সঙ্গে ঘর করছেন। দুবার তিনি বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে লালু প্রসাদের হাত ধরেছিলেন। তাতে অবশ্য তাঁর নিজের ইবিসি ভোট ব্যাঙ্কের কোন ক্ষতি হয়নি। বিজেপি সঙ্গে থাকার সময় পদ্ম শিবিরের উচ্চবর্ণের লোকেরা নীতীশের অতি পশ্চাৎপদ ভোটারদের সামাজিক সুরক্ষা দিয়েছে। জাতপাতের কোন সংঘাত তাদের মধ্যে হয়নি। আবার লালুপ্রসাদের সঙ্গে জোটে থাকার সময় নীতীশের ইবিসি ভোটারদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেছেন যাদবদের সহায়তায়। লালু নীতীশ একসঙ্গে থাকার সময় মধ্যবর্গীয় যাদব এবং নীতীশের কুর্মি এবং অতীত পশ্চাৎপদ ভোটারদের ভোটারদের মধ্যে সংঘাত শূন্যে নেমে এসেছিল। নীতীশের এই নিশ্চিত ভোট ব্যাঙ্ককে সুরক্ষা দেওয়ার শর্তেই বিহারে বিজেপি হিন্দুত্বের দামামা সেভাবে বাজাতে পারেনি। পদ্ম শিবির কে কোন উগ্র কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেননি তিনি। যেমন স্বয়ং বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা মুখ্যমন্ত্রী নীতীশের কাছে দাবি করেছিলেন উত্তর বিহারের সীমাঞ্চল এলাকায় সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবারের পরিবর্তে রবিবার করতে হবে। মুসলিম বহুল ওই এলাকায় বহু বছর ধরেই সাপ্তাহিক ছুটি থাকে শুক্রবার। বিজেপি এই ব্যাপারে বারে বারে আপত্তি জানালেও নীতীশ সাড়া দেননি। বিহারের ভোট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন রাজ্যের সামাজিক স্তরে মুসলিমদের সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের অতি পশ্চাৎপদ অংশের সদ্ভাব রয়েছে। সংখ্যালঘু বিরোধী কোন পদক্ষেপের কারণে ফাটল ধরতে পারে পশ্চাৎপদ অংশের ভোট ব্যাংকেও।
বিজেপি নেতারা এখন অনুধাবন করছেন নীতীশকে মুখ্যমন্ত্রী করার ঘোষণা না করা হলে তাঁর সঙ্গে থাকা প্রায় ৩৬ শতাংশ অতি অনগ্রসর সম্প্রদায়ের ভোটারদের একাংশ বিরোধী জোটের দিকে চলে যেতে পারে। সেই কারণেই নীতীশের মন্ত্রিসভার উপ মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপির সবচেয়ে পরিচিত মুখ সম্রাট চৌধুরীকে দিয়ে দলের তরফে ঘোষণা করা হয়েছে এনডিএ ক্ষমতায় থেকে গেলে নীতীশ কুমারই হবেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিহারে বিজেপির এই কৌশল বদল কে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা অনেকেই প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের মণ্ডল রাজনীতির কাছে আরও একবার পরাজয় বলে মনে করছেন। ১৯৯০ এ সরকার পতনের মুখে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ আটের দশকের গোড়ায় জমা হওয়া মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট কার্যকর করেছিলেন। সেই থেকে দেশে মণ্ডল-কমণ্ডল রাজনীতির সূচনা হয়েছিল। পরে নরসিংহ রাও প্রধানমন্ত্রী হয়ে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ মেনে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৭ শতাংশ পদ ও আসন অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণির জন্য সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেন। সেই মণ্ডল রাজনীতিকে হাতিয়ার করেই রাজনীতিতে উত্থান লালু প্রসাদ যাদব, নীতীশ কুমার, মুলায়ম সিং যাদব, কাশীরাম, মায়াবতীর মতো নেতাদের।
তাছাড়া বিহারে দু'বছর আগে কাস্ট সেনসাস বা জাতি শুমারি করিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ। তাতে জানা গিয়েছে বিহারে ওবিসি বা অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণির মধ্যে ৬০ শতাংশ যাদব সম্প্রদায়ের মানুষ। অন্যদিকে এক্সট্রিম ব্যাকওয়ার্ড বা অতি পশ্চাৎপদ অংশ হল ৩৬ শতাংশ। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর লালুপ্রসাদ যেমন যাদব ও মুসলিমদের নিয়ে নিজের ভোট ব্যাংক গড়ে নিয়েছেন তেমনই নীতীশের সঙ্গে আছে অতি পশ্চাৎ অংশের সিংহভাগ মানুষ।