আত্মবিশ্বাস আর রসায়নে দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ৬০ বছরের অধ্যাপিকা মমতা পাঠক রীতিমতো পড়ালেন বিচারকদের।

আদালতে দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষসমর্থনে যুক্তি দেন মহিলা
শেষ আপডেট: 29 May 2025 14:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্বামীকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন অভিযুক্ত। এমন সময় হাইকোর্টের বিচারপতি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার স্বামীকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে আপনি কী বলবেন?’
সেই মুহূর্তে আত্মবিশ্বাস আর রসায়নে দীর্ঘদিনের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ৬০ বছরের অধ্যাপিকা মমতা পাঠক জানিয়ে দিলেন, ‘স্যার, ময়নাতদন্তে তাপদগ্ধ ক্ষত আর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ক্ষতের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব নয়।’
বিচারপতি বিবেক আগরওয়াল এবং বিচারপতি দেবনারায়ণ মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চের সামনে আদালত যেন পরিণত হল সংক্ষিপ্ত এক রসায়ন ক্লাসে। অভিযুক্ত মমতা পাঠক, যিনি এক বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, জটিল একটি বিষয়কে ব্যাখ্যা করে বললেন কীভাবে বৈদ্যুতিক প্রবাহ শরীরের কোশের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, কোন কোন কণার জমাট বাঁধার লক্ষণ দেখা যায়। কীভাবে বিক্রিয়া ভিত্তিক পরীক্ষা থেকেই একমাত্র বোঝা সম্ভব কী কারণে মৃত্যু হয়েছে। শুধুমাত্র ক্ষতস্থান চোখে দেখে নয়, পরীক্ষাগারে সেই প্রতিক্রিয়াগুলোর বিশ্লেষণই সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
এই ব্যতিক্রমী মুহূর্ত মমতা পাঠকের বিরুদ্ধে খুনের মামলার শুনানিতে ঘটেছে, যা ঘিরে আইনি মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, ‘সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে অদ্ভুত আইনি আত্মপক্ষ সমর্থন’ এটি।
২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল, মধ্যপ্রদেশের ছত্রপুরে মমতা পাঠকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তিনি তাঁর স্বামী নীরজ পাঠককে (একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চিকিৎসক) ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে পরে ইলেকট্রিক শক দিয়ে হত্যা করেন। এরপর তিনি তাঁর ছেলেকে নিয়ে ঝাঁসিতে চলে যান।
পুলিশি তদন্তে উঠে আসে, মমতা ১ মে ঝাঁসি থেকে ফিরে এসে স্বামীর মৃতদেহ দেখতে পান বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু তারপরই সামনে আসে নীরজ পাঠকের একটি ভয়েস রেকর্ডিং, যেখানে তিনি বলছেন স্ত্রী তাঁকে নির্যাতন করতেন। আরও বিস্ফোরক ছিল তাঁদের ড্রাইভারের সাক্ষ্য, যিনি জানান, মমতা নিজেই তাঁকে বলেছিলেন ‘একটা বড় ভুল হয়ে গেছে’।
এই সবকিছু মামলাকে নতুন দিকে ঘুরিয়ে দেয়। পরে উঠে আসে তাঁদের দাম্পত্য জীবনের নানা টানাপড়েন। জানা যায়, একসময় মমতা পাঠক স্বামীর বিরুদ্ধে গার্হস্থ্যহিংসার অভিযোগ আনেন এবং বলেন, তাঁর খাবারে নেশাদ্রব্য মেশানো হয়েছিল। যদিও তিনি পরে অভিযোগটি তুলে নেন।
সেশন কোর্ট তাঁকে পরিকল্পিত খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এরপর তিনি হাই কোর্টে আপিল করে গত বছর জামিন পান।
গত ২৯ এপ্রিল মামলার সর্বশেষ শুনানির পর হাইকোর্ট রায় স্থগিত রেখেছে। মমতা পাঠক এখনও জামিনে মুক্ত রয়েছেন।