
গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 7 April 2025 18:06
সালটা ২০১৩, অবৈধভাবে বাড়ির একটা গাছ কাটার জন্য এক বৃদ্ধাকে দিতে হয়েছিল ১০ হাজার টাকা জরিমানা। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন ওই গাছের ডাল তাঁর বাড়ি নষ্ট করছিল, তাই গাছটা কাটার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মামলা চলাকালীন তিনি কোনওভাবেই তা বুঝিয়ে উঠতে পারেননি। অবাক হলেও গাছ কাটার শাস্তি তখনও বহাল ছিল দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে। গোটা দেশের যখন অন্যতম বড় সমস্যা পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাওয়া, দেশবাসী যখন পরিবেশ বাঁচাতে ব্যস্ত, তখন পথ দেখিয়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশ-তেলঙ্গনা।
বৃদ্ধার মামলাটি চলার সময় অবশ্য তেলঙ্গনা মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। স্বাধীনতার স্বাদ পেতে লড়াই চালাচ্ছে এক শ্রেণি। গোটা ব্যাটন অন্ধ্রপ্রদেশ তথা টিডিপির হাতে। কেন এই জরিমানা করা হয়েছিল? কেন নেমে এসেছিল শাস্তির খাঁড়া? যেখানে অল্পবিস্তর গাছ তো সবাই কাটে!
সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০১২ সাল থেকে ২০১৩ সালের মার্চ মাস, এক বছরে ২০ হাজার ৭৩৩টা গাছ কাটা হয়েছিল হায়দরাবাদ ও আশপাশের এলাকায়। উন্নয়নের কাজেই মাঠ হয়ে গেছিল বিঘার পর বিঘা জমি। সেসময় আন্দোলন-বিক্ষোভ কিছুই সেভাবে কাজে আসেনি। পায়ের তলায় মাটি থেকে অল্প হলেও মাটি সরে গেছে বুঝতে পেরে কড়াকড়ি শুরু হয়। আর সেই কড়াকড়ির ফলই ২০১৩-তে বৃদ্ধাকে ভোগ করতে হয়।
২০১৩-র পর ২০১৪, ভাগ হল অন্ধ্রপ্রদেশ, ভারতের মানচিত্রে জুড়ল তেলঙ্গনা। ক্ষমতায় টিএসআর। মুখ্যমন্ত্রী কেসিআর। প্রথম ২ বছর দারুণ কাজ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল স্থানীয় ওই রাজনৈতিক দল। ঝাঁ চকচকে স্টেশনে নেমে সেকথা ২০১৮ সালেও মনে হয়েছিল। তবে, ওইদিন উন্নয়ন, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে ছাপিয়ে যা নজর কেড়েছিল, তা সেখানকার প্রকৃতি। স্টেশনে ঘুরে বেড়াচ্ছে ময়ুর, হালকা হাওয়ায় ভেসে আসছে কেকাধ্বনি, সারি সারি সবুজ গাছ, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট-বড় পাহাড়। হরিণ খেলে বেড়াচ্ছে অদূরে। হালকা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রঙ্গারেড্ডি জেলার বুক চিরে যখন ক্যাব এগোচ্ছিল তখন খানিকটা অবাকই হতে হয়েছিল। কারণ সেই প্রকৃতিই। মনে হয়েছিল, পরিবেশ বাঁচিয়েও কীভাবে উন্নয়ন সম্ভব তার নিদর্শন বোধহয় হায়রাবাদই।
কাট টু ২০২২, কোভিড পরবর্তী সময়। তখন ধীরে ধীরে সব গোছাতে শুরু করেছে সমস্ত রাজ্য। সেই একই স্টেশনে নামার পর চেনা ছবিটা উধাও। নেই ময়ুর, হরিণ, গাছ এমনকি পাহাড়ও। পাহাড়ও গায়েব! এও সম্ভব! স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, উন্নয়ন হচ্ছে। উন্নয়নের জন্যই কাটা পড়ছে গাছ, মাঠ হয়ে যাচ্ছে আস্ত পাহাড়, টিলাও। তবে, এই দৃশ্য তাঁদের কাছে নতুন নয়। তাঁরা ১৯৯৭-৯৮ সাল থেকে এমন দেখে আসছে। চোখের সামনে ঝাঁ চকচকে হাইটেক সিটি হতে দেখা যতোটা আনন্দের, ততোটাই কষ্টেরও। সেসময়ও একর একর জমি মাঠ হয়ে গেছিল রাতারাতি। পশু-পাখিরা হারিয়েছিল ঘর, তাঁদের কান্না বুকে ধরেই উন্নয়নের পথে এগিয়েছিল তৎকালীন অন্ধ্রপ্রদেশ।
আজ এত কথার একটাই কারণ, তেলঙ্গনার নির্বাক পশু-পাখিগুলোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার হাহাকার। দূর-দুরান্ত থেকে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ। হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের চিৎকার, আন্দোলন।
কাঞ্চা গাচিবোওলির ৪০০ একর জমি ধুলো উড়িয়ে সাফ করেছে হায়দরাবাদ সরকার। রবিবার দুপুর পর্যন্ত ৫০টি আর্থ মুডিং মেশিন দিয়ে কয়েক একর জমি ইতিমধ্যেই খালি করা হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ছবি-ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে ময়ুর উড়ছে, ঘরছাড়া হরিণ, শয়ে শয়ে পাখি, মরে পড়ে আছে হরিণ শাবক। এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে কুঁকড়ে ওঠছে সকলে। প্রতিবাদের আওয়াজ পৌঁছেছে প্রশাসন পর্যন্ত।
চলতি বছর জানুয়ারিতে সরকার ওই ৪০০ একর ফাঁকা করার অনুমোদন দিলেও তাতে আপাতত স্থগিতাদেশ দিয়েছে তেলঙ্গনা হাইকোর্ট। ফলে বন্যপ্রাণ ধ্বংস স্থগিত রয়েছে।
পিছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, যে তেলঙ্গনার বুকে এমন ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে, তাতে ২০২৪ সালেও দেশে প্রকৃতি রক্ষার পথপ্রদর্শক বলা হত। ২০২১ সালের ইন্ডিয়া স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট বলছে, ২০১৯ ও ২০২০ সালে যেখানে ওই রাজ্যে ৬৩২ স্কয়্যার কিলোমিটারে গাছ লাগানো ছিল সেখানে ২১-এ তা বেড়ে হয়েছে ৬৪৭ স্কয়্যার কিলোমিটার। অর্থাৎ গাছ লাগানোর পরিমাণ বেড়েছে।
তবে, রিপোর্ট যাই বলুক, বাস্তবের চিত্রটা বলেছে অন্যকথা। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেছে, ওই রাজ্যে পরিবেশ রক্ষায় ঠিক যেমন আচরণ করা উচিত ছিল সরকারের, কোনও সরকারই তা করেনি। ফলে ধীরে ধীরে ময়ুররা হারিয়ে গেছে, কমেছে সংখ্যায়, বাসা হারিয়ে ভ্যানিস অন্যান্য পশু-পাখিও।
যে রঙ্গারেড্ডি দেশের একটা বড় অংশকে চাকরি দেয়, দেশের যুব সমাজের একটা বড় অংশ যে রাজ্য, যে জেলার ওপর নির্ভরশীল, তারা ৫ লক্ষ কর্মসংস্থানে জোর দিয়ে গাচিবোওলিকে আইটি হাব বানানোর পথে এগোবে না পড়ুয়াদের, পরিবেশপ্রেমীদের আবেদন শুনে-বুঝে ও নির্বাক-অবলাদের কথা ভেবে ফের মুড়িয়ে দেওয়া জমিতে নতুন প্রাণকে স্বাগত জানাবে, সেটাই দেখার।