মহারাষ্ট্র সফরে প্রশাসনের প্রোটোকল লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি গাভাই। তামিলনাড়ু মামলার রায় ও বিচারব্যবস্থার ‘ওভাররিচ’ বিতর্কের পটভূমিতে তাঁর মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাই
শেষ আপডেট: 18 May 2025 19:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিচারবিভাগের প্রোটোকল লঙ্ঘনের একটি স্পষ্ট বার্তা দিলেন প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাই (Chief Justice BR Gavai)। তাঁর নিজেরই রাজ্য মহারাষ্ট্রে সফরের সময় প্রশাসনের অসহযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে মুম্বইয়ে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বললেন, 'গণতন্ত্রের তিন স্তম্ভ– বিচারব্যবস্থা, আইনসভা ও প্রশাসন। এই তিনটিই সমান। একে অপরকে সম্মান দেখানো উচিত।'
গত মাসেই দেশের শীর্ষ বিচারপতির পদে নিযুক্ত হয়েছেন প্রধান বিচারপতি গাভাই। তিনি প্রথম দ্বিতীয় দলিত ব্যক্তি, যিনি এই পদে বসেছেন। তবে পদে বসার পরে প্রথম নিজের রাজ্যে সফরে এসে তিনি মোটেই খুশি হননি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় (Maharashtra Protocol Row)। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিল মহারাষ্ট্র ও গোয়ার বার কাউন্সিল। মহারাষ্ট্রের মুখ্য সচিব, রাজ্যের পুলিশ মহাপরিচালক (DGP) এবং মুম্বই পুলিশ কমিশনার-- এই তিন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না।
এই বিষয়টি ভাল চোখে দেখেননি প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, 'যখন একজন মহারাষ্ট্রের (Maharashtra) মানুষ দেশের প্রধান বিচারপতি হন এবং নিজের রাজ্যে প্রথমবার আসেন, তখন মুখ্য সচিব, পুলিশ মহাপরিচালক ও পুলিশ কমিশনার উপস্থিত না থাকাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি কোনও নতুন প্রোটোকল নয়। বরং এটি সংবিধানের এক অংশ থেকে আর এক অংশকে সম্মান জানানোর প্রশ্ন।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'যখন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রথমবার রাজ্য সফরে আসেন, তখন তাঁর প্রতি কেমন আচরণ দেখানো উচিত, তা নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা করা উচিত। যদি আমাদের মধ্যে কেউ এই ধরনের প্রোটোকল ভঙ্গ করত, তাহলে ইতিমধ্যেই সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যেত। এসব ছোট ছোট বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণ মানুষকেও এগুলো জানানো উচিত।'
এর পর যখন প্রধান বিচারপতি চৈত্যভূমি, অর্থাৎ ডঃ আম্বেদকরের স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনে যান, তখন অবশ্য মুখ্য সচিব সুজাতা সাওনিক, মহাপরিচালক রেশ্মি শুক্লা ও পুলিশ কমিশনার দেবেন ভারতী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মনে করা হচ্ছে, প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের পরেই তাঁরা সেখানে পৌঁছন।
চৈত্যভূমিতে সাংবাদিকরা যখন প্রধান বিচারপতির কাছে তাঁর মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন, 'আমি প্রোটোকল নিয়ে কড়া নই। শুধু যা ঘটেছে, সেটাই বলেছি।'
তবে গোটা দেশে যখন বিচার ব্যবস্থার ‘ওভাররিচ’ (Judicial Overreach) বা অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে গাভাইয়ের এই মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্প্রতি তামিলনাড়ু সংক্রান্ত এক মামলায় রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালদের ভূমিকা নিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয় সুপ্রিম কোর্টের রায়, যা অনেকের নজর কেড়েছে। ওই মামলায় আদালত সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেয় যে, রাজ্যপাল যদি কোনও বিল আটকে রাখেন, তা হলে সেটি বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারিতার শামিল। আদালত জানায়, কোনও সাংবিধানিক বিষয় থাকলে রাষ্ট্রপতির উচিত সেই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেওয়া।
এ বিষয় নিয়ে পাল্টা চিঠি লেখেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও (Draupadi Murmu)। তিনি সুপ্রিম কোর্টের কাছে জানতে চান, সংবিধানের ২০০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যখন কোনও রাজ্যপালের সামনে কোনও বিল আসে, তখন তিনি মন্ত্রিসভার পরামর্শ মেনে চলতে বাধ্য? রাজ্যপালের সংবিধান-স্বীকৃত নিজস্ব বিবেচনার ব্যবহার কি বিচারযোগ্য? ২০১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তাহলে কি আদালত সেই সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারে?
প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ে বলা হয়, সাংবিধানিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আদালতেরই একমাত্র অধিকার রয়েছে। এক্ষেত্রে নির্বাহী শাখা যেন নিজে সিদ্ধান্ত না নেয়, তারা যেন আদালতের কাছেই প্রশ্নটি তুলে ধরে। কেবল রাজনীতি সংক্রান্ত বিষয়েই যেন আদালত নিজেকে দূরে রাখে। কিন্তু সাংবিধানিক স্বার্থ ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। রায়ে আরও বলা হয়, 'যদি কোনও বিল গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী হয় এবং তার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে, সেক্ষেত্রে রাজ্যপাল সেই বিল রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য পাঠাতে পারেন। কিন্তু একমাত্র আদালতই তা খতিয়ে দেখতে পারে।'
এই রায়ের পরেই বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে সুপ্রিম কোর্টের সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) কি রাষ্ট্রপতির মতো নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকেও নির্দেশ দিতে পারে? সুপ্রিম কোর্ট কি নিজের সীমা ছাড়াচ্ছে না? যদি সব কিছু আদালতের হাতে চলে যায়, তবে সংসদ ও বিধানসভা বন্ধ করে দেওয়া হোক।' তাঁর এই মন্তব্যের পর বিজেপি অবশ্য নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানায়, দল সর্বদা বিচারব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।