মুম্বইয়ের জলপথ দিয়ে ১০ পাকিস্তানি জঙ্গি ভারতে ঢুকে এই হামলা চালিয়েছিল শহরের বেশ কয়েক জায়গায়।

দেবিকার বয়স তখন ছিল মাত্র ৯ বছর।
শেষ আপডেট: 26 November 2025 10:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুম্বই জঙ্গি হামলার ১৭ বছর পূর্ণ হল। দেশের প্রধান বাণিজ্য নগরী সহ বিদেশেও দিনটি বিশেষ স্মৃতিতে পালিত হচ্ছে। কারণ, ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর যে জঙ্গি হামলা হয়েছিল, তাতে দেশ-বিদেশের মোট ১৬৪ জন নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুম্বই পুলিশের বিজয় সালাসকর, অশোক কামতে ও এটিএস প্রধান হেমন্ত কারকারে।
মুম্বইয়ের জলপথ দিয়ে ১০ পাকিস্তানি জঙ্গি ভারতে ঢুকে এই হামলা চালিয়েছিল শহরের বেশ কয়েক জায়গায়। তার মধ্যে একমাত্র জীবিত জঙ্গি আজমল কাসবকে প্রাণ দিয়ে ধরে ফেলেছিলেন পুলিশ কনস্টেবল তুকারাম ওম্বলে। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া শরীরেও জাপটে ধরেছিলেন কাসবকে। যার ফলেই এই জঙ্গি হামলার মূল চক্রীদের সম্পর্কে খোলসা হয়। আর সেই ঘটনার সর্বকনিষ্ঠ প্রত্যক্ষদর্শী দেবিকা রোতাওয়ানের নির্ভীক সাক্ষ্যে ফাঁসি হয় কাসবের। দেবিকার বয়স তখন ছিল মাত্র ৯ বছর।
দেবিকা এখন ২৬ বছরের যুবতী। কিন্তু, আজও সেদিনের কথা মনে পড়লে তাঁর বুক ডুকরে ওঠে। সেদিন আজমল কাসবের একে ৪৭ থেকে ছিটকে আসা গুলি ডান পায়ে লেগেছিল ছোট্ট দেবিকার। যার ফলে সারা জীবনের মতো তিনি সেই গুলির ক্ষত ও আতঙ্ক নিয়ে বড় হয়েছেন। দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর দেবিকা এক বিরাট ন্যায়বিচার পেয়েছেন। হাইকোর্টের নির্দেশে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে নিজের ঘর পেয়েছেন মুম্বই হামলার অন্যতম সাক্ষী।
জঙ্গি হামলার পর তৎকালীন মহারাষ্ট্র সরকার দেবিকা ও তার পরিবারকে পাকাপাকি ঘর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু, সেই প্রতিশ্রুতি বছরের পর বছর ধরে কাগজে-কলমেই থেকে গিয়েছে। ২০২০ সালে দেবিকা সেই প্রতিশ্রুতির দাবি নিয়ে বম্বে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। শেষমেশ ২০২৪ সালে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে ৬ মাসের মধ্যে বাড়ির ব্যবস্থা করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
এ বছরের জানুয়ারি মাসে শিবশাহি পুনর্বাসন প্রকল্প লিমিটেড দেবিকা ও তাঁর পরিবারকে একটি এক কামরায় ফ্ল্যাট তুলে দিয়েছে। মাত্র ৩০০ বর্গফুটের কিছু কম পরিসরের ফ্ল্যাটটি আন্ধেরির আম্বোলি এলাকায়। সেদিনের ঘটনা স্মরণ করতে গিয়ে দেবিকা বলেন, আমার ডান পায়ে গুলি লেগেছিল। পায়ের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছিল সেন্ট জর্জ হাসপাতালে, ওই হাসপাতালেই আমি জন্মেছিলাম। ওই একটা বুলেট আমার পুরো জীবন বদলে দিয়েছিল।

খুব অল্প বয়সেই দেবিকার মা মারা যান। কঠিন লড়াই চালিয়ে বড় হওয়ার মধ্যেও তিনি আজও বলতে পারেন, কাসব একটা মশার মতো। আমি চাই যারা এই হামলার পিছনে যারা ছিল, তাদের শাস্তি হোক। আমি তাই একজন আইপিএস অফিসার হতে চাই। শুধু জঙ্গি বুলেটই নয়, দেবিকার জীবনে আরও সংঘর্ষ চালাতে হয়েছে। তার টিবি ধরা পড়ে। তার বাবা ওই অবস্থায় সরকারি দফতরে দফতরে ঘুরে বেড়িয়েছেন মেয়ের জীবনের জন্য। পরে পুলিশ যখন দেবিকাকে কাসবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে ডাকে, সে একবাক্যে রাজি হয়ে যায়।
দেবিকা বলেন, আমি ক্রাচে ভর দিয়ে আদালতে যেতাম। সেই সময় আমি প্রথম ভালো করে কাসবকে দেখতে পাই। এবং দেখেই চিনে ফেলি। ওরা আমাকে তিনজনকে দেখিয়েছিল, কিন্তু আমি ওকে তখনই চিনে ফেলেছিলাম। সেই সময় দেবিকার জন্যই তার পরিবারকেও অনেক কঠিন সময়ের মোকাবিলা করতে হয়েছে। তার বাবার শুকনো ফলে ব্যবসা ছিল। কিন্তু, সরবরাহকারীরা তাঁকে জোগান দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। পাছে জঙ্গিদের বিষনজরে পড়তে হয়। পরিজনরা তাদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে। স্কুল ভর্তি নিতে চায়নি। স্কুল কর্তৃপক্ষ বলেছিল, সে ভর্তি হলে জঙ্গিরা স্কুলই উড়িয়ে দিতে পারে। দেবিকা বলেন, চার বছর আমি পড়াশোনা করতে পারিনি। তারপর একটি সংস্থার সাহায্যে ভর্তি হতে পারি। কিন্তু, এখনও আমার মন থেকে ভয় কাটেনি।