দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা সময় ক্যানসারের কোনও অ্যানসার ছিল না। এখন আছে। ফুসফুস, ত্বক, অন্ত্র, জরায়ু, প্রস্টেট—মারণ রোগের যে কোনও ধরনেরই চিকিৎসা আছে। তাও কর্কট রোগ তার জাল বিছিয়েই চলেছে। আজ ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যানসার দিবসে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য সামনে এনেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) । সমীক্ষা বলছে, পিছিয়ে পড়া, আর্থিকভাবে অনুন্নত দেশগুলিতে ক্যানসারের প্রকোপ বেড়েছে ৮১ শতাংশ। সেই তালিকায় রয়েছে আমাদের দেশও। রোগ নির্ণয়ে গলদ, চিকিৎসায় খামতি এবং সচেতনতার অভাব যার অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার কন্ট্রোল (UICC)-এর উদ্যোগে প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যানসার দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ক্যানসার প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রাথমিক অবস্থায় ক্যানসার নির্ণয় করার ওপর সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টাই হল বিশ্ব ক্যানসার দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ২০০৮ সাল থেকে এই দিনটিতে নানারকম পরিকল্পনা নেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। কর্কট রোগকে নির্মূল করার অঙ্গীকার নেওয়া হয় বিশ্বজুড়ে। ‘আই অ্যাম অ্যান্ড আই উইল’ (I am and I will)—আমি পারি, এবং আগামী দিনেও পারব, ক্যানসার নামক মারণ রোগকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারি আমরা— ২০১৯-২১ সাল পর্যন্ত বিশ্ব ক্যানসার দিবসের থিম এটাই।
প্রতি বছরের মতো এবারও জেনেভার সম্মেলনে ক্যানসার প্রতিরোধের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অ্যাসিস্টান্ট ডিরেক্টর জেনারেল রেন মিনঘুই বলেছেন, ‘‘বিপদঘণ্টি বেজে গেছে। ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে তুল্যমূল্য বিচারে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা পিছিয়ে পড়া দেশগুলিতেই বেশি।’’ সেই সংখ্যাটাও নাকি হাড়হিম করে দেওয়ার মতো। অন্তত ৮১ শতাংশ ক্যানসার আক্রান্ত অনুন্নত দেশগুলিতেই রয়েছে এবং সেই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুও। রেন আরও বলেন, ক্যানসার একটা রোগের নাম, মৃত্যুদণ্ডের সাজা নয়। সঠিক সময় রোগ নির্ণয় হলে এই মারণ রোগের চোখ রাঙানি বন্ধ করা সম্ভব। গোটা বিশ্বেই ক্যানসার চিকিৎসা যতটা গতি পেয়েছে, তাতে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসায় সেটা সাড়ানো তো সম্ভবই, এমনও দেখা গেছে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্টেজে ধরা পড়া রোগও উন্নত চিকিৎসায় নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। তার জন্য চাই সচেতনতা। যেটা পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে নেই।
কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কর্কট রোগ?
কোষের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধিই এই মারণ রোগের অন্যতম কারণ। ফুসফুস, ত্বক, অন্ত্র, প্রস্টেট, স্তন, জরায়ু, ক্যানসারের শাখা-প্রশাখা অনেক। তাদের কারণও একাধিক। হু-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি একটি মাল্টি ফ্যাকটোরিয়াল ডিজিজ। আমাদের দেশের প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন। ফি বছর পাঁচ লক্ষেরও বেশি ক্যানসারের আক্রমণে প্রাণ হারান। এই আক্রান্তদের কম করেও বয়স ২৫ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। নতুন রোগাক্রান্তদের সংখ্যা ১২ লক্ষেরও বেশি।
আমাদের দেশে কী কী কারণে বাড়ছে ক্যানসার? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, এর কারণ অনেক।
প্রথমত, বাড়তি ওজন বা ওবেসিটি। ওজন নিয়ন্ত্রণ না করলে নারী পুরুষ নির্বিশেষে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। খাদ্যাভাসই এর জন্য মূলত দায়ী। এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুর কারণ ‘হাই বডি-মাস ইনডেক্স।’
দ্বিতীয়ত, তামাক এবং অ্যালকোহল। সিগারেট, বিড়ি, গুটখা, খৈনি সহ যাবতীয় তামাকজাত নেশার কারণে ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়েছে অন্তত ২২ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে, তামাকজাত নেশা এবং অ্যালকোহলের কারণে ২০৪০ সালের মধ্যে ক্যানসার রোগে মৃতের সংখ্যা বাড়বে অন্তত ৬০ শতাংশ।
তৃতীয়ত, ফুসফুস, কোলেস্টেরল, লিভার ও স্তন ক্যানসারে বহু মানুষের মৃত্যু হয় এই দেশে। সেডেন্টারি লাইফস্টাইলও ক্যানসার ডেকে আনতে পারে।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের ডিরেক্টর এলিসাবেট ওয়েইডারপাস বলেছেন, ২০০০-২০১৫ সালের মধ্যে উন্নত দেশগুলিতে ক্যানসারের প্রকোপ কমেছে ২০ শতাংশ। সচেতনতা ও উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থাই এর কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে, বিভিন্ন অসুখ নির্ণয়ে বায়োপসি এখন সব দেশেই স্বীকৃত। কিন্তু বায়োপসি নিয়ে মানুষের ভয় আর আতঙ্ক এখনও কাটেনি। যার ফলে অসুখ নির্ণয় সঠিকভাবে হয় না। টিউবারকিউলোসিস, ত্বকের অসুখ সোরিয়াসিস, অন্ত্র, স্তনের টিউমার-সহ নানান রোগ নির্ণয়ে বায়োপসি করতে হয়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষেরই ধারণা বায়োপসি মানেই সেটা ক্যানসারের কারণ। এই ভয় এবং গাফিলতির কারণে অনেকক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়ে না। যার কারণে চিকিৎসাতেও বিলম্ব হয়, এবং পরিণতি ভয়ঙ্কর মৃত্যু।