.webp)
শেষ আপডেট: 14 December 2023 16:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: টেট উত্তীর্ণ হয়েও শিক্ষিকা না হতে পারার আক্ষেপ নিয়েই পৃথিবী ছাড়তে হয়েছিল ৩০ বছরের মুনমুন ঘোষকে। তাঁদের ছোট্ট মেয়ে পূরণ করুক মায়ের স্বপ্ন। সেই লক্ষ্যেই নিজের সমস্ত সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে গিয়ে লড়ছেন মুনমুনের স্বামী সুব্রত। একমাত্র মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলার লড়াইটা কঠিন জানেন। তবুও মুনমুনকে দেখেই শিখেছেন ধৈর্য কীভাবে ধরতে হয়।
স্কুলজীবন থেকেই লেখা পড়ায় নিজের মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন মুনমুন ঘোষ। মন্তেশ্বর থানার উজনা গ্রামের এক প্রান্তিক চাষি পরিবারের মেয়ে মুনমুন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ করে বিএড ও করেন। স্বপ্ন ছিল স্কুল শিক্ষিকা হওয়ার। সেই স্বপ্ন নিয়েই ২০১৪ সালে প্রাইমারি ’টেট’ পরীক্ষা দেন। কোয়ালিফাইও করেন। তারপর থেকেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন। চাকরিটা ঠিক হয়ে যাবে।
এরই মধ্যে আর পাঁচটা বাবা মায়ের মতো মুনমুনের বাবা- মাও তাঁদের মেয়েকে পাত্রস্থ করার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেন। সেইমত ২০১৯ সালে জামালপুর থানার জাঙ্গীরপুর গ্রামের চাষি পরিবারের ছেলে সুব্রত খোরটের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ২০২০ সালে মা হন মুনমুন। সেই কন্যা সুনয়নার বয়স এখন চার ছুঁইছুঁই। স্থানীয় অঙ্গনওয়াড়ি স্কুলে ’বর্ণ পরিচয়ের’ পাঠ নিচ্ছে সুনয়না। মেয়েকে বড় করতে করতেই স্কুল শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্নটা জিইয়ে রেখেছিলেন মুনমুন। কিন্তু তা আর পূরণ হয়নি।
সুব্রত জানান, তখন দেশজুড়ে করোনার দাপট চলছে। ওই বছরের জুন মাসে হঠাৎ করেই একদিন মুনমুন জ্বরে আক্রান্ত হন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ওষুধ খেয়েও জ্বর কমে না। এদিকে জ্বরের মধ্যেই শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। এই অবস্থায় আর কোনও ঝুঁকি না নিয়ে তাঁরা মুনমুনকে বর্ধমানের একটি নার্সিংহোমে ভর্তি করেন। সেখানে টানা ১৫ দিন চিকিৎসা চললেও শেষরক্ষা হয়নি। ওই বছরে ১৩ জুলাই মারা যান মুনমুন। তাঁর কথায়, “আমি মুনমুনের মতো উচ্চশিক্ষিত নই। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। আমি আর আমার বাবা মিলে পারিবারিক চার বিঘা জমি চাষ করি। তা থেকে সামান্য যে অর্থ উপার্জন হয় তা দিয়েই আমাদের সংসার চলে। তবে এ নিয়ে মুনমুনের কোনও আক্ষেপ ছিল না। প্রাইমারি ’টেট’ পরীক্ষায় ’কোয়ালিফাই’ করার পর যেহেতু একবার ২০১৬ সালে এবং তারপর ২০২১ সালের প্রথম দিকে ’ভাইবা’ হয়ে গিয়েছিল, তাই ওর আশা ছিল তাঁর চাকরিটা হবেই। বেতনের টাকায় নিজের মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে উচ্চশিক্ষিত করবে। ওর সেই আশা পূর্ণ হল না। এখন আমারই দায়িত্ব ওর স্বপ্ন সফল করার।”
সুব্রতর মা কল্পনাদেবী বলেন, “ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আর বঞ্চনায় ’টেট’ উত্তীর্ণ অনেক যোগ্য চাকরি প্রার্থীর মতো আমার বৌমারও স্কুল শিক্ষিকা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সেই আক্ষেপ বুকে নিয়েই অকালে আমার বৌমাকে চলে যেতে হল। বৌমার স্বপ্ন যাতে তাঁর মেয়ে পূরণ করতে পারে সেটা দেখাই আমাদের কাজ। আমার ছেলে সুব্রতও তাই চায়।”
কল্পনাদেবী জানান, ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়ে জয়ী হন। দীর্ঘ পাঁচ বছর জ্যোৎশ্রীরাম গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্বাচিত সদস্যা ছিলেন। তাঁর ছেলে সুব্রত বাম আমল থেকে সক্রিয় ভাবে তৃণমূল ক্ংগ্রেস করছে । বৌমার চাকরিটা যাতে হয়ে যায় দলের অনেক নেতা, সাংসদ ও বিধায়কের কাছে অনুরোধ রেখেছিলাম। কিন্তু কেউ পাত্তা দেয়নি। এমনকি নাতনির ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমার ছেলেকে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যেও দলের নেতাদের কাছেও অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু সব নেতার কাছ থেকেই শুধু প্রত্যাখ্যান মিলেছে।
জামালপুরের তৃণমূল বিধায়ক অলক মাঝি অবশ্য সুব্রত ও তাঁর মেয়ের পাশে দাঁড়াবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। দলের পুরনো এই কর্মীর বাড়িতে গিয়ে সমস্যার বিষয়ে খোঁজ খবর নেবেন বলে জানিয়েছেন।