দ্য ওয়াল ব্যুরো: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি। জঙ্গল লাগোয়া গ্রামের সীমানায় মুন্নিদেবীর আধখাওয়া দেহটা দেখে চমকে উঠেছিলেন বন দফতরের কর্মীরা। রণথম্বোর জাতীয় উদ্যানের কোনও বাঘই মানুষখেকো নয়। তাহলে এমনটা ঘটল কীভাবে? ঠিক তার পরদিন আরও এক ভয়ঙ্কর মৃত্যু। বাগানের মালির খুবলে খাওয়া দেহটা খুঁজে পাওয়া যায় জঙ্গলের ধারে। তারপর থেকে লাগাতার চলছে মানুষহত্যা। নরখাদকদের ভয়ে সন্ধে হলেই ঘরে দোর দেন গ্রামবাসীরা। রণথম্বোরের আকাশে বাতাসে আতঙ্কের ছায়া। এই বুঝি ঘাড়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঘ।
চলতি বছরের ১৬ অক্টোবর। রণথম্বোর জাতীয় উদ্যানে রণংদেহী মূর্তিতে যুদ্ধ শুরু হয় দু’টি বাঘের। আঁচড়ে-কামড়ে সেই যুদ্ধের প্রলয়ঝড় ক্যামেরাবন্দি করে পোস্ট করেন ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস অফিসার প্রবীণ কাসওয়ান। এলাকা দখলের লড়াই, না সঙ্গিনী বাছার প্রতিযোগিতা, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে সে দু’টি বাঘও ছিল মানুষখেকো।
উত্তর ভারতের সবচেয়ে বড় এবং পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র এই রণথম্বোর জাতীয় উদ্যানের কয়েকটি ঘটনা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় একটা সময়। রাজস্থানের বন দফতর জানাচ্ছে জাতীয় উদ্যান লাগোয়া গ্রামে কিছু মানুষের মৃত্যুর পরই সতর্কতা আরও বাড়িয়ে দেয়। জাতীয় উদ্যান লাগোয়া জনবসতি এলাকায় অনেক বেশি নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারকে অনুরোধ করেছে
ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA) । কিন্তু কেন রণথম্বোরের কিছু রয়্যাল বেঙ্গল মানুষখেকো হয়ে উঠছে তার সঠিক জবাব এখনও মেলেনি। কিছু সম্ভাব্য তথ্য সামনে এনেছে এনটিসিএ।
দিনের আলোয় বিভীষিকা টি-১০৪, রাতে একা পেলেই পিছু নেয় টি-২৪
চার বছরের টি-১০৪ যে নরখাদক হয়ে যাবে ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি জাতীয় উদ্যানের কর্মী ও অফিসাররা। মায়ের থেকে আলাদা সরিয়ে নেওয়ার পরেই তার মেজাজ বদলে যায়। প্রথম শিকার প্রৌঢ়া মুন্নিদেবী। দ্বিতীয় বাগানের মালি পিন্টু। তাঁর শরীরের সামান্য অংশই বেঁচেছিল। কোন এক নৃশংস আক্রোশে পিন্টুকে ছিঁড়ে-খুবলে খেয়ে ছিল চার বছরের টি-১০৪। বাঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষের রক্তের স্বাদ পেয়েছে যে বাঘ তাকে থামানো সম্ভব নয়। সেই বাঘের গতিবিধি যেমন হয় অত্যন্ত কৌশলী, তার স্বভাব ও শিকার ধরার পদ্ধতিতেও আসে বদল। অনেক বেশি সতর্ক হয়ে চলাফেরা করে সেই বাঘ, ফাঁদে ধরা দেয় না কিছুতেই।
ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া হত্যালীলা বাড়তে থাকে ক্রমশ। টি-১০৪ এর পরবর্তী শিকার হয় রূপ সিং। সেটা অগস্টে, কাইলাদেবী সংরক্ষণ কেন্দ্রের কাছে। সেপ্টেম্বরে আরও দুটো মানুষ যায় তার পেটে। টি-১০৪ বাঘটিকে যখন ট্র্যাক করা শুরু করেন বনকর্মীরা, দেখা যায়, এই বাঘের বিচরণ এলাকার বাইরেও মানুষ শিকার চলছে। সেটা ঘটাচ্ছে আরও কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক বাঘ ও বাঘিনী। জঙ্গল লাগোয়া গ্রামে পাহারা বসান বনকর্মীরা। জঙ্গলের ত্রিসীমানায় গ্রামবাসীদের আসা নিষেধ হয়ে যায়। ৭ অক্টোবর রাতে ফের শোরগোল ওঠে গ্রামে। বছর নয়েকের একটি ছেলে তার মায়ের সামনেই ছিঁড়ে খেয়েছে বাঘ। তাকে বাঁচাতে গিয়ে জখম সেই মহিলাও।
[caption id="attachment_153471" align="aligncenter" width="1000"]
রণথম্বোর জাতীয় উদ্যানের এই শান্ত পরিবেশে আজ আতঙ্কের ছায়া[/caption]
কেন মানুষখেকো হয়ে উঠছে রণথম্বোরের বাঘরা?
অনুভূতি আছে বাঘদেরও...
রাজস্থানের প্রিন্সিপাল চিফ কনজারভেটার এবং চিফ ওয়াইল্ড লাইফ ওয়ার্ডেন অরিন্দম তোমর বলেছেন, খাদ্যের অভাব নেই জাতীয় উদ্যানে। এর পিছনে রয়েছে অন্য কারণ। প্রথম মায়ের কাছ থেকে আলাদা হওয়ার পরে টি-১০৪ বাঘের স্বভাবে বদল আসে। দ্বিতীয়ত, তাকে জঙ্গলের কোর এলাকায় ছেড়ে আসার সময় কিছু রক্ষীরা তাকে মারধর করে। এই খবর সাধারণত বাইরে আসে না, তবে বন দফতর জানে মানুষখেকো সন্দেহ হলেই একটা আক্রোশ জন্মায় বাঘের উপরে। তখন নানা ভাবে তাকে খোঁচানো, মারধর ইত্যাদি করে থাকেন বন দফতরের কর্মীরা। সুযোগ পেলে বাঘের দিকে পাথর ছুড়ে ব্যতিব্যস্ত করেন গ্রামবাসীরা। টি-১০৪ বাঘটির সঙ্গে ঠিক তেমনই কিছু হয়েছিল। যার পর থেকেই মানুষ শিকারের প্রতি একটা নেশা জন্মায় এই বাঘের।
অরিন্দম তোমর বলেছেন, প্রায় ১০০ জন লোক মিলে টি-১০৪ বাঘটিকে পাকড়াও করেছিল। যদিও তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, কিন্তু ছাড়ার আগে তাকে মারধর করা হয়েছিল বলে শোনা গেছে। পাথরের আঘাতে আহতও হয়েছিল সে। জঙ্গলের সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫০ মিটার গভীরে ছেড়ে আসার পরদিনই ফের মানুষ মেরেছিল টি-১০৪।
আরও পড়ুন: রণথম্বোরে রণংদেহি, ত্রিকোণ প্রেম নাকি জায়গা দখলের লড়াই, রইল ভিডিও
এলাকা দখলের লড়াই
ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস অফিসার প্রবীণ কাসওয়ান তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টে যে ভিডিও পোস্ট করেছিলেন তাতে দেখা গিয়েছিল টি ৫৭ ও টি ৫৮ নামে দুটি বাঘ লড়াইতে মেতেছে। আদতে এরা দুই ভাই। তর্জন-গর্জনের সঙ্গে এই মল্লযুদ্ধে আহত হয় অপ্রাপ্তবয়স্ক বাঘটি। মনে করা হয়, এলাকা দখল তো বটেই, বাঘিনী টি-৩৯ বাঘিনীর উপর অধিকার নিয়েও লড়াই বেঁধেছিল দুই ভাইয়ের।
দেখুন সেই ভিডিও:
https://www.facebook.com/TheWallNews/videos/2390466304501800/?v=2390466304501800
এর আগে আরও একবার দুই বাঘের মল্লযুদ্ধের সাক্ষী হয় রণথম্বোর। তিন বছরের টি-১০৯ বাঘকে আঁচড়ে-কামড়ে রক্তাক্ত করে দেয় তারই ভাই টি-১০৮। টি-১০৯ বাঘটিকে বনকর্মীরা আদর করে ডাকতেন বীরু, আর টি -১০৮ বাঘের নাম ছিল জয়। জয়ের শক্তি অনেক বেশি। সেই যুদ্ধ থামানো গেলেও বীরুকে বাঁচানো যায়নি। জখম ছিল জয়ও। পরে এই জয় ওরফে টি-১০৮ মানুষখেকো হয়ে যায়। বছর নয়েকের এক কিশোর তার শিকারে পরিণত হয়।
এনটিসিএ জানাচ্ছে, বর্তমানে রণথম্বোরে ৩০টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ ও ২৮টি বাঘিনী রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক বাঘদের নিয়ে। এদের বাড়বৃদ্ধি কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না পূর্ণবয়স্করা। ফলে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেঁধে যাচ্ছে মাঝেমধ্যেই। জখম হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্করা এবং তারাই মানুষখেকো হয়ে উঠছে। কারণ বন্যপ্রাণী শিকারের থেকে মানুষ শিকার অনেক বেশি সহজসাধ্য বাঘদের কাছে। রণথম্বোরের বাঘদের নরখাদক হয়ে ওঠার পিছনে এটাও সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন:
https://www.four.suk.1wp.in/national-news-tiger-count-rises-33-in-india-but-the-roar-is-uneven-across-states-says-government-report-2019/
https://www.four.suk.1wp.in/pujomagazine2019/%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a5-%e0%a6%93-%e0%a6%a4%e0%a7%8e%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a6%be/