দ্য ওয়াল ব্যুরো: কনকনে শীত, পুলিশের লাঠি, জল কামান উপেক্ষা করে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানের কয়েক হাজার কৃষক চারদিক থেকে রাজধানী দিল্লিকে ঘিরে ফেলেছেন। এ যেন গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার মতোই ব্যাপার।
কেন্দ্রের নতুন কৃষি আইন নিয়ে তাঁদের আপত্তি। এবং তা প্রত্যাহারের দাবিতে তাঁরা এতটাই আপসহীন যে দু’মাসের রেশন নিয়ে বিক্ষোভে নেমেছেন। এমনিতেই পাঞ্জাব, হরিয়ানার মানুষের জেদ মারাত্মক। তাঁদের সঙ্গে সমঝোতার পথ অতীতেও সহজ ছিল না।

কিন্তু কী কারণে তাঁদের এই অসন্তোষ? আপত্তি ও আশঙ্কার বিষয়গুলো কী কী? বিস্তারিত ভাবে ও পয়েন্ট অনুসারে ব্যাখ্যা করা রইল নীচে।
মোদী সরকারের তিন নয়া আইন
প্রথম আইন: ফার্মার্স প্রডিউস ট্রেড অ্যান্ড কমার্স (প্রমোশন অ্যান্ড ফেসিলিটেশন) আইন ২০২০-- এই আইনের বলে চাষীরা এখন রাজ্য সরকারের নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত মান্ডি বা বাজারের বাইরেও তাদের কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারবে। এ জন্য কোনও কর বা ফি-র বোঝা থাকবে না।
আগে সেই সুযোগ ছিল না। এপিএমসি তথা কৃষিপণ্যের বিপণন কমিটি আইন অনুসারে সরকার নিয়ন্ত্রিত বাজারেই কৃষিপণ্য বিক্রি করতে হত চাষীদের।

দ্বিতীয় আইন: ফার্মার্স (এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড প্রোটেকশন) এগ্রিমেন্ট অব প্রাইস অ্যাসিওরেন্স-- এই আইনের ফলে চাষীরা এখন সরাসরি ও বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারে। ফসল উৎপাদনের পর তাঁরা চুক্তি করতে পারেন। বা ফসল উৎপাদনের আগেই চুক্তি করতে পারেন চাষীরা।
তৃতীয় আইন: কৃষি পরিষেবা আইন ২০২০ এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন ২০২০-- প্রধান কৃষি পণ্যগুলির মজুত ও সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনও নিয়ন্ত্রণ আর থাকবে না। তা পুরোপুরি বাজার নিয়ন্ত্রিত হবে। তবে হ্যাঁ, সংকটের পরিস্থিতিতে সরকারের হাতে মজুত নিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকবে। যেমন বন্যা, খরা, বাজারে কোনও কৃষিপণ্য হঠাৎ অপ্রতুল হয়ে পড়া বা তার দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি।
কারা এই আইনের বিরোধিতা করছেন বা করছে?
কৃষক: এখানে বলে রাখা ভাল, দেশের সব কৃষক এই আইনের বিরোধিতা করছেন না। যেমন পশ্চিমবঙ্গে সামগ্রিক ভাবে এই আইনের বিরুদ্ধে কৃষক অসন্তোষ দেখা যায়নি। মূলত পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশের বড় অংশের কৃষক এই নয়া আইনের বিরোধিতা করছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই আইনের ফলে কৃষকদের বড় কর্পোরেটের দয়ায় বেঁচে থাকতে হবে এবং এর ফলে সরকার কৃষিপণ্যের যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য দেয়, সেই ব্যবস্থাই উঠে যাবে।

কেন্দ্রের কৃষি আইনের বিরোধিতা করে পাঞ্জাব বিধানসভায় ইতিমধ্যে সংশোধন প্রস্তাব পাশ হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, এর ফলে পাঞ্জাব কেন্দ্রের ওই তিন কৃষি আইনের আওতায় আর থাকবে না। কিন্তু হরিয়ানায় বিজেপি সরকার কৃষকদের সেই দাবিতে রাজি হয়নি। ফলে ভারতীয় কৃষক ইউনিয়নের নেতা নেতা গুরনাম সিংহ চাদুনির নেতৃত্বে কৃষকরা আন্দোলনে নেমেছেন। হরিয়ানার সমস্ত বিরোধী দল এবং জাতীয় স্তরে সমস্ত কৃষক সংগঠন তাঁদের সমর্থন করছে।
ফড়ে তথা মধ্যসত্ত্বভোগী: দেশের অধিকাংশ এলাকাতেই বাজারের সঙ্গে কৃষকদের সম্পর্ক। সে ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেন এক শ্রেণির মধ্যসত্ত্বভোগী। তাঁদের আশঙ্কা নতুন আইনের ফলে তাঁদের ব্যবসা কারবার সংকটের মুখে পড়বে। ঘটনা হল, এরা নিজেরা কেউ হয়তো কৃষকই নন।

রাজ্য সরকার: পাঞ্জাবের মতো সরকারের আশঙ্কা এর ফলে তাদেরও রাজস্ব ক্ষতি হবে। কারণ, এপিএমসি মান্ডিগুলো থেকে সরকার কর বা ফি পায়। মান্ডির গুরুত্ব কমে গেলে বা কৃষকরা মান্ডির বাইরে স্বাধীন ভাবে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ পেলে সরকারের রাজস্বের ক্ষতি অনিবার্য।
রাজনৈতিক আপত্তি: অনেক জায়গাতেই এপিএমসি বাজারগুলিতে দুর্নীতির ঘুঘুর বাসা রয়েছে বলে বহুদিনের অভিযোগ। এক শ্রেণির মধ্যসত্ত্বভোগী ও স্থানীয় রাজনীতিকদের এ ব্যাপারে যোগসাজস রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা এর ফলে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে।

কৃষকদের উদ্দেশে মোদী সরকারের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা
-
ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কোনও ভাবে প্রত্যাহার করা হবে না। এ ব্যাপারে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। এ প্রসঙ্গে ত্রিপুরার উদাহরণ দিচ্ছেন নির্মলা সীতারামনরা। বাম জমানায় সেখানকার চাষীরা ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পেতেন না। বর্তমান সরকারের আমলে সেই ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
-
কৃষকরা কোথায় তাঁদের পণ্য বিক্রি করবেন সে ব্যাপারে তাঁদের স্বাধীনতা থাকবে।
-
চুক্তি চাষের ক্ষেত্রে কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণে কৃষকদের সমানাধিকার থাকবে। চাইলে যে কোনও সময়ে তাঁরা চুক্তি ভেঙে দিতে পারেন। কিন্তু কর্পোরেট ক্রেতা যদি কোনও সময়ে চুক্তি ভাঙে বা শর্ত লঙ্ঘন করে তা হলে জরিমানা দিতে হবে। চাষীদের নির্ধারিত দাম মিটিয়েও দিতে হবে।
-
দেশে ১০ হাজার ফার্মার-প্রডিউসার অর্গানাইজেশন গড়ে তোলা হবে। কর্পোরেট সংস্থাগুলির সঙ্গে ক্ষুদ্র চাষীদের দর কষাকষিতে তারা সাহায্য করবে।
-
কৃষকরা সরাসরি ক্রেতাকে পণ্য বিক্রির সুযোগ পেলে কোনও ফড়েকে কাটমানি দিতে হবে না। কোথাও কোনও লেভি বা ফি-ও দিতে হবে না।
-
এপিএমসি বাজারগুলিতে এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। কাজে স্বচ্ছতা আসবে।

কৃষকদের আশঙ্কা ও দাবি
-
সরকার আজ মিষ্টি মধুর কথা বলছে। কোনও দিন দুম করে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য তুলে দেবে না, এর কি গ্যারান্টি রয়েছে? কেন তা আইনেই বলে দেওয়া হল না। সুতরাং ন্যূনতম সহায়ক মূল্য চালু রাখার বিষয়টিকে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে।
-
কর্পোরেটদের হাতে অনেক টাকা। ক্ষমতাও বেশি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর আশঙ্কাও রয়েছে। তারা চাষীদের বোকা বানাতে পারে।
-
ছোট কৃষকদের অবস্থা খারাপ হবে। কারণ, কর্পোরেট সংস্থাগুলি চাইবে বড় কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি করতে।
-
তিনটি আইনই বাতিল করতে হবে।