দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের অর্থনীতির বিষয়ে আলোচনায় তিনি বরাবরই স্পর্শকাতর ও স্পষ্টবাক। তা সে অতীতে সর্বভারতীয় কংগ্রেসের প্লেনারি অধিবেশনে অর্থনৈতিক প্রস্তাবের খসড়া রচনা নিয়ে আলোচনার সময়ে হোক বা পরবর্তী কালে মন্ত্রিসভার বৈঠকে।
বৃহস্পতিবারও তার অন্যথা হল না। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের উদ্দেশে বর্তা দিয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় স্পষ্ট কথায় বলেন, ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কি স্বর্গ থেকে আসছে? দেশের পূর্বতন সব সরকার এর ভিত গড়ে দিয়ে গিয়েছে।
সম্প্রতি সংসদে বাজেট বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, গত সত্তর বছরে ভারত মাত্র ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে পৌঁছেছে। আগামী পাঁচ বছরে গড় জাতীয় উৎপাদন ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে মোদী সরকার। তার পর থেকে রাজনৈতিক সভাতেও প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা তা এখন বলে বেড়াচ্ছেন।
সেই প্রসঙ্গ টেনেই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বলেন, “অর্থমন্ত্রী বাজেটে কী বলেছেন শুনেছি। ওঁকে মনে রাখতে হবে, ব্রিটিশরা এই অর্থনীতির ভিত গড়ে দিয়ে যায়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কালে সেই ভিত গড়েছে উপর্যুপরি সব সরকার।”
'সমৃদ্ধ ভারত ফাউন্ডেশন' নামে একটি প্রতিষ্ঠান গত কাল দিল্লিতে একটি বক্তৃতা সভার আয়োজন করেছিল। ‘ফার্দারিং ইন্ডিয়াজ প্রমিস’ শীর্ষক ওই বক্তৃতায় প্রণববাবুই ছিলেন প্রধান বক্তা। এ প্রসঙ্গে সেখানে তিনি আরও বলেন, “জওহরলাল নেহরু ও আমাদের পূর্বসুরীরা আইআইটি, ইসরো, আইআইএম, ব্যাঙ্কিং নেটওয়ার্ক ইত্যাদি গড়ে তোলার কারণেই ভারতের অর্থনীতি বহু গুণে বেড়েছিল। এর পরে মনমোহন সিংহ ও নরসিংহ রাও মুক্ত অর্থনীতির পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান। তার জেরে ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আরও বিকাশ হয়। এবং সেই ভিতরে উপর দাঁড়িয়েই অর্থমন্ত্রী (নির্মলা সীতারমন) দাবি করতে পারেন যে ভারত ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হয়ে উঠবে।”
বক্তৃতায় প্রণববাবু আরও বলেন, “যাঁরা ৫৫ বছরের কংগ্রেস সরকারের সমালোচনা করছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন স্বাধীনতার পরে দেশের কী অবস্থা ছিল, আর এখন আমরা কোথায় এসে পৌঁছেছি। হ্যাঁ, এর নেপথ্যে অন্যদেরও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আধুনিক ভারতের ভিত যাঁরা গড়েছেন তাঁরা যোজনাবদ্ধ অর্থনীতিতে বিশ্বাস করতেন। আজকের মতো ভাবনা তাঁদের ছিল না, যখন প্ল্যানিং কমিশনকেও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।”
তাঁর কথায়, “ওই সব পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো বৃদ্ধি, শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্য স্থির করা হতো। তার পর সেই অনুযায়ী সেই সব খাতে সুসংসহত ভাবে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং নির্মলা সীতারমনের সঙ্গে প্রণববাবুর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল। মোদী সরকারের প্রথম জমানায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রণববাবুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। এ বার দ্বিতীয় মেয়াদে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পদের দায়িত্ব নেওয়ার পরও প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গিয়ে দেখা করেছিলেন নির্মলা।
কিন্তু পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রণববাবুর গতকালের বার্তা ছিল বৃহত্তর। নেহরু-গান্ধী পরিবারের সমস্ত অবদানকে রাজনৈতিক ভাবে খাটো করে দেখানোর একটা প্রয়াস বর্তমান সরকারের তরফে শুরু হয়েছে। নির্মলা যে ভাবে ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে ৫ ট্রিলিয়নে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছেন, তার উদ্দেশ্যও বিজেপি-র সেই রাজনৈতিক লক্ষ্যের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
এখানেই আপত্তি করেছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি। এমনকি বক্তৃতায় তিনি এ-ও বলেন, এই যে চন্দ্রযান যাত্রা করবে। এটা কোনও ম্যাজিক নয়। এটা এক দিনে হয়নি। এর জন্যও দীর্ঘদিন সময় লেগেছে ভিত গড়তে।